
একুশে প্রতিবেদক : একজন শিক্ষককে জেলে যেতে হলে বিচারককে ‘ভাত খেতে দেবেন না’ ও ‘চাকরি করতে দেবেন না’ বলে হুমকি দিয়েছেন কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) সাইমুম সরওয়ার কমল।
শনিবার (১১ মার্চ) কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির রামু উপজেলা শাখা আয়োজিত শিক্ষক মিলনমেলা, নবীন বরণ, বিদায় ও কৃতি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, ‘রামুর একজন শিক্ষক। নাম জসিম উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। আমি জজ সাহেবের সাথে কথা বলেছি। দ্রুত বিচার, ঘটনা মিথ্যা, কোনো ঘটনা নাই। জমি জমা নিয়ে গন্ডগোল। সেখানে কোনো মারামারি হয়নি। কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই। কোনো স্বাক্ষী নেই। কিন্তু একজন পেশকার একজন জজকে ম্যানেজ করে একটা দ্রুত বিচার আইনে মামলা দিয়েছে।’
‘ইনশাআল্লাহ আমি বেঁচে থাকতে তাকে জেলে আমি যেতে দেব না। তাকে যদি জেলে যেতে হয় তাহলে আমি বেঁচে থাকতে যে জজ সাহেব সে মিথ্যা মামলা করেছে, তাকে আমি জীবনে ভাত খেতে দেব না। তাকে আমি চাকরি করতে আর দেব না। এই আমার কথা।’ বলেন এমপি কমল।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা সকলেই থাকবেন, শিক্ষকের বিপদে শিক্ষককে আসতে হবে। একজন শিক্ষকের বিপদে সমস্ত শিক্ষককে এক সাথে জানাতে হবে। কোন শিক্ষক যদি কোথাও অসম্মানিত হয়, তাহলে আমার আসনের প্রত্যেকটি স্কুল এক সাথে বন্ধ করে দিতে হবে।’
‘শিক্ষক সমিতি, প্রতি মাসে আপনারা মিটিং করবেন। আপনাদের সম্মান রক্ষার্থে, জীবন রক্ষার্থে, সম্পদ রক্ষার্থে এই সমিতি কার্যকর ভূমিকা যাতে পালন করে।’ যোগ করেন এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল।
শিক্ষকদের নিয়ে এতই দরদ দেখানো এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের বিরুদ্ধে রামুর এক প্রবীণ শিক্ষকের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য একটি অনুষ্ঠানে অতিথি দাওয়াত দেয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষকের ছেলের সঙ্গে মতবিরোধের জের ধরে জনসম্মুখেই ন্যাক্কারজনক এ ঘটনাটি ঘটান আওয়ামী লীগের এ সংসদ সদস্য। লাঞ্ছনার শিকার শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মা সংসদ সদস্য কমলকে শিশুকালে পড়িয়েছেন।
২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি দুপুরে রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালায় নির্মিতব্য বিকেএসপি মাঠ এলাকায় জনসম্মুখে এ ঘটনা ঘটে। শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মা রামুর চৌমুহনী এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা।
শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মা সে সময় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০১৪ সালে রামুর উত্তর কাহাতিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অবসর নেন তিনি। বর্তমানে ঈদগাঁওর কালিরছরায় বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি খালেকুজ্জামান ও শহিদুজ্জামানের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত রত্নাগর্ভা রিজিয়া আহমেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিনের মতো রোববার দুপুর দেড়টার দিকে বর্তমান স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এ সময় জোয়ারিয়ানালা বাজারে দক্ষিণ পাশে বিকেএসপির নির্মিতব্য মাঠে মাটি ভরাট কাজ উদ্বোধন উপলক্ষে স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলসহ অন্যদের দেখে গাড়ি থেকে নামেন তিনি। সবার সঙ্গে কাজ উদ্বোধনী মোনাজাতে অংশ নেন।’
মোনাজাত শেষ করে এমপি কমল তার দিকে এগিয়ে এসে স্যার সম্বোধন করে কুশল বিনিময় করেন। স্কুল থেকে ফিরছি শুনে হঠাৎ বলেন, ‘তোর ছেলে সুজন ঢাকায় আমার বিরুদ্ধাচরণ করছে। আমার মতের বাইরে যাওয়া আমি একদম পছন্দ করি না। তাকে সাবধান করে দিস। নইলে গায়েব করে ফেলব।’
শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মা বলেন, আমি হতভম্ব হয়ে ‘তুই-তোকারি’ করে কথা বলার কারণ জানতে চাইলে তিনি আরও কাছে এসে গলায় হাত দিয়ে ধাক্কা মারেন। এরপর পাঞ্জাবি টেনে ধরে বলেন, ‘তোর ছেলেকে সাবধান করবি। নইলে খবর আছে।’ উপস্থিত সবাই আশ্চর্য হয়ে বিষয়টি চেয়ে চেয়ে দেখেছে। কেউ এমপি কমলের অপকর্মের প্রতিবাদ করেনি।
সুনীল কুমার শর্মা বলেন, প্রবীণ শিক্ষক হিসেবে এলাকার সবাই আমাকে সম্মান করেন। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নই। আমার ছেলে সুজন শর্মা ঢাকায় রামু সমিতির সাধারণ সম্পাদক। সমিতির অভিষেকে অতিথি দাওয়াত নিয়ে সুজনের সঙ্গে কমলের বিরোধ হয়েছে। ছেলের সঙ্গে বিরোধের জন্য প্রকাশ্যে আমারই ছাত্র এমপি কমল আমাকে লাঞ্ছিত করল।
তিনি আরও বলেন, এটি বড়ই লজ্জার। ভাবতেও আমার গা শিউরে উঠছে। আমি রামু শহরের মণ্ডলপাড়ার বাড়িতে গিয়ে কমলকে পড়িয়েছি। এখন কমল সংসদ সদস্য। এটা নিয়ে গর্ব হয়। তাই আসার পথে উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করছে দেখে আনন্দিত হয়ে গাড়ি থেকে নেমেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, নিজেই নিজের লাঞ্ছনা হাতে ধরে এনেছি। লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
প্রবীণ শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মাকে লাঞ্ছনার ঘটনায় কক্সবাজার সদর আসনের এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল সরাসরি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও একটি বিবৃতি পাঠান। বিবৃতিতে শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মাকে তিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তি কমিটির সহযোগী বলে আখ্যায়িত করেছেন। শিক্ষকতাকালীন সময়ে সুনীল শর্মার বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণেরও অভিযোগ রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন এমপি কমল। আর সুনীল কুমার শর্মা তাকে (এমপি কমলকে) শিশুকালে কখনোই কোনোভাবে পাঠদান করেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
এমপি কমলের এই বিবৃতির জবাবে শিক্ষক সুনীল কুমার শর্মা গণমাধ্যমকে বলেন, আমি তাকে (এমপি কমলকে) ছোটবেলায় পড়িয়েছি কিনা তা তার বড় ভাই রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল, বোন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী ও তার মা ভালো করেই জানেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কমলের বয়স ছিল এক-দেড় বছর। আমি রাজাকার ছিলাম কিনা তা এমপি কমলের বাবা সাবেক এমপি ও মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ভালোই জানতেন। তিনিই আমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লিখিত স্বীকৃতি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম বলেই ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনী আমাকে খুঁজতে এসে না পেয়ে আমার ভাইকে তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান হানাদাররা। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য থানায় করা এমএলএ মামলাটির আমিই প্রথম আসামি হিসেবে অভিযুক্ত ছিলাম। এসব তথ্য কি প্রমাণ করে আমি রাজাকার ছিলাম?
ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে সুনীল কুমার শর্মা বলেন, সমাজে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের শত্রু থাকে। আমাকে নাজেহাল করতেই একটি স্বার্থন্বেষী মহল ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছিল। যার বিচারক ছিলেন কমলের বাবা ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী। যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল কিনা তার বাবাসহ বিচারে থাকা অন্যরা ভালোই জানেন। আমাকে নানা কটুক্তিমূলক বাক্যে অপদস্ত করে যদি এমপি কমল উঁচুতে উঠতে পারে তাতে আমার দুঃখ নেই।