
ফারুক আবদুল্লাহ : চলতি মাসে ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ২০টি অর্থনীতির জোট জি-২০ সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনব্যাপী সম্মেলন। বুধবার (২৯ মার্চ) রাতে নৈশভোজের মধ্য দিয়ে এ আয়োজন শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সম্মেলনের মূল আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
এবার জি-২০-র সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে এবার। ভারতের যেকোনো শহর ঘুরলে সর্বত্র চোখে পড়বে জি-২০ সম্মেলন ঘিরে কর্মযজ্ঞ। গোলচত্বর, ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ ও বিমানবন্দরগুলো সাজানো হয়েছে সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। আগামী ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মূল সম্মেলন।
সেই আয়োজনে অতিথি হিসেবে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশসহ ৮টি দেশ। এই সম্মেলনকে ঘিরে লোগোর নকশায় ভারতের জাতীয় ফুল পদ্ম ব্যবহার করা হয়েছে। সাত পাপড়ির এ পদ্মে সাত মহাদেশ ও সঙ্গীতের সাত স্বরকে ইঙ্গিত করা হয়। স্লোগান হিসেবে নেওয়া হয়েছে ‘এক বিশ্ব, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’।
তবে এ সম্মেলন শুরুর আগে সমস্যা সমাধানে বিশ্ব এক হতে না পারার বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘বিশ্ব শাসন ব্যর্থ হয়েছে’ এবং বহুপাক্ষিক ঐক্য যে হুমকির মুখে আছে সেটি যেন তারা স্বীকার করে নেন।
এদিকে জি-২০ মূলত অর্থনীতিবিষয়ক জোট হলেও এবারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সম্মেলনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়টিই আলোচনার মুখ্য বিষয় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বিভাজন ভারতকে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। যদিও ভারত চায় এ সম্মেলনে দারিদ্র বিমোচন এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়টি প্রাধান্য পাক।
নয়াদিল্লিতে জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ বড় পর্দায় সম্প্রচার করা হয় এবং বিভেদ ভুলে উন্নয়নশীল বিশ্বের সংকট সমাধানের দিকে নজর দিতে জি-২০ জোটভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘এক গভীর বৈশ্বিক বিভাজনের সময়ে আমরা এ বৈঠকে অংশ নিচ্ছি। আজকে এই কক্ষে যারা উপস্থিত নেই, তাদের প্রতিও আমাদের অনেক দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে। ইংরেজিতে রেকর্ড করা মোদির উদ্বোধনী ভাষণ সম্প্রচার করা হয় যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের কথা সরাসরি উল্লেখ না করলেও মোদি স্বীকার করেছেন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবারের সম্মেলনে প্রভাব ফেলবে। গত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সন্ত্রাসবাদ এবং যুদ্ধের মতো ঘটনা দেখেছি। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বিশ্বব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরও বলেছেন, যেসব সমস্যা আমরা সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে পারব না, সেসব সংকট তৈরিই হতে দেওয়া যাবে না। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বড় ফারাক রয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ চীন ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি নিন্দা জানায়নি। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মস্কোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণে ভারতের ওপর চাপ বাড়ছে। ভারত এখন পর্যন্ত চাপ সামলে যাচ্ছে।
রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। এ ছাড়া ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের নিন্দা না জানালেও গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে মোদি বলেছিলেন, এটা যুদ্ধের সময় নয়। এমন পরিস্থিতিতে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে ভারত কিভাবে সম্মেলন সফল করবে, তার দিকে বিশ্বের নজর রয়েছে। ভারতকে এমন বিশেষ কিছু করতে হবে যাতে এই নেতারা যুদ্ধের বিভেদকে উপেক্ষা করতে সক্ষম হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ নিয়ে নিরপেক্ষ নীতি বজায় রাখা ভারতকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতি একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাতে গেলে খুবই সুচিন্তিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে গত সপ্তাহে জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলন কোনো মতৈক্য ছাড়াই শেষ হয়। ওই সম্মেলনে সমাপনী বিবৃতিতে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ভাষায়’ নিন্দা জানানো হলে ওই বিবৃতি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় মস্কো এবং বেইজিং।
বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি বিঙ্কেন মন্তব্য করেছেন, ‘ইউক্রেনে বিনা উস্কানিতে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং অন্যায় যুদ্ধের কারণ বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।’ অপরদিকে, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ‘ব্যাকমেইল ও হুমকি’ সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তীব্র মতবিরোধে ব্যাঙ্গালুরুর জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনের মতো দিল্লির এই সম্মেলনেও কোনো যৌথ বিবৃতি আসছে না বলে জানিয়েছে আয়োজক দেশ ভারত।
বৃহস্পতিবারের আলোচনার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর চেয়ারম্যান হিসাবে বৈঠকের সারসংক্ষেপ পেশ করেন। তিনি বলেন, সম্মেলনে বহু বিষয় ছিল। আরও খোলাখুলি বলতে গেলে সম্মেলনের অংশগ্রহনকারীরা ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। এই যুদ্ধ নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। কিছু দেশের মেরুপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা এই সম্মেলনে সেতুবন্ধন গড়তে পারিনি।