
ফারুক আবদুল্লাহ : বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে ভয়াল রাত নেমে এসেছিল ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সালে। এ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাযজ্ঞ চালায় ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরেই চালানো হয় গণহত্যা।
সেদিন ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এর মধ্যেই প্রতিরোধযুদ্ধে নামে বাঙালি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সেই সংগ্রামে প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। আর সেই পথ ধরে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
এবার একাত্তর সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সংঘটিত বর্বরোচিত গণহত্যার ওপর ইতিহাসে প্রথমবারের মত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহযোগিতায় এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন। তিনদিনব্যাপী প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের গণহত্যার ২৭টি ছবি দেখানো হয়। এগুলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে সংগ্রহ করা হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত এগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির পর এবারই প্রথম জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ১৯৭১ সালে গণহত্যার শিকার শহীদদের সম্মানে এ ধরনের চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, প্রবাসী বাংলাদেশি ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ২৯ মার্চ প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন। তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী ১৯৭১ সালের গণহত্যা বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করে।
ঐতিহাসিক এই আয়োজন সফল করতে সকল সহযোগিতা প্রদানের জন্য জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশন ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ বলে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এই প্রদর্শনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টাকে তরান্বিত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
একইভাবে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং গণহত্যার ইতিহাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে গভীরভাবে ছড়িয়ে দিতে আমাদের আরও জোর প্রচেষ্টা চালানো দরকার। আজকের এই প্রদর্শনী কেবল আমাদের ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে সহায়তা করবে না, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বব্যাপী গণহত্যা এবং অন্যান্য নৃশংস অপরাধ রোধের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সকলের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে ৪ এপ্রিল পাকিস্তানের কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়: পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, তাদের অভিযোগের পর জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী অবিলম্বে বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন ওই ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করে। পাকিস্তানের অভিযোগ, ওই ছবির প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের এক তরফা ও বিতর্কিত বর্ণনা ছিল।
গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মমতাজ জাহরা বালোচ বলেছেন, তথাকথিত ছবির প্রদর্শনীটি জাতিসংঘে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে একতরফা ও বিতর্কিত বর্ণনা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিল।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের ভুল উপস্থাপনা এবং জাতিসংঘের নিয়ম না মেনে আয়োজন করার কারণে চিত্র প্রদর্শনীটি অবিলম্বে বন্ধ করা হয়। আমরা এ ব্যাপারে জাতিসংঘের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করি।
তিনি বলেন আমরা বিশ্বাস করি যে, ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের তৎকালীন নেতৃত্বের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছিল। পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপারে আন্তরিক।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ মিশনের উদ্যোগে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চালানো গণহত্যার ছবি নিয়ে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনী প্রসঙ্গে পাকিস্তানের গণমাধ্যেমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা সত্য নয় বলে জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় গণহত্যা দিবস ২০২৩ উপলক্ষে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলদেশ মিশন কর্তৃক আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীটি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের পূর্ণ সহযোগিতায় এবং প্রতিষ্ঠানটির সকল নিয়ম মেনেই আয়োজন করা হয়েছে।
অতএব ‘নিয়ম না মেনে বা ইতিহাস বিকৃত করে প্রদর্শনী আয়োজন করায় জাতিসংঘ প্রদর্শনী বন্ধ করে এবং বিতর্কিত ছবিগুলো নামিয়ে ফেলে’ বলে যে দাবি করা হয়েছে তা সত্য নয়, বরং নিতান্তই বানোয়াট। গত ২০ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।