:: একুশে প্রতিবেদক ::
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলা তদন্তে গতি নেই। এখনো ‘ধারণার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে তদন্ত কাজ। এক দারোয়ানের তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় ব্যবহার করা মোটরসাইকেলটি পাঁচলাইশ থানার টহল টিম উদ্ধার করে। মোটরসাইকেলের সূত্র ধরে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পিবিআই। আর সে হিসেবে মামলার তদন্তের মূল দায়িত্বে থাকা নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য নেই।
ডিবির কাজ বলতে, গত বুধবার হাটহাজারী থেকে আবু নছর গুন্নু নামের এক ব্যক্তিকে ধরা ও মাইক্রোবাসটি আটক করা পর্যন্ত। যদিও মাজার নিয়ে বিরোধের জের ধরে আবু নছরকে স্পর্শকাতর এ মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর ঘটনার সাথে মাইক্রোবাস ও তার চালকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ডিবির যে কর্মকর্তাকে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে, অতীতে তার এ ধরনের মামলা তদন্তের অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও অতীতে বড় ঘটনার রহস্য উন্মোচনের নজির নেই। এই অবস্থায় ঘটনার রহস্য উন্মোচনে খোদ বাবুল আক্তারকে মাঠে নামতে হবে -বলছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, বর্তমানে মামলাটি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে না। ঘটনার পর যেভাবে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। তদন্তে দক্ষ কর্মকর্তাদেরও সম্পৃক্ত করা হয়নি। রহস্য উন্মোচনে গোয়েন্দা পুলিশ মূল দায়িত্বে থাকলেও, ইউনিটটিতে এখন দক্ষ কর্মকর্তা নেই। এসআই সন্তোষ চাকমা, রাজেশ, আফতাব, লিয়াকতসহ বেশ কয়েকজন আলোচিত মেধাবী কর্মকর্তা সম্প্রতি ডিবি থেকে বদলী হয়েছেন। এসব কর্মকর্তাদের লিডার ছিলেন এডিসি (ডিবি) বাবুল আক্তার। তিনি ডিবির চৌকস অফিসারদের সাথে নিয়ে জঙ্গিসহ ভয়ংকর অপরাধীদের ধরতে দুঃসাহসী অভিযানে নামতেন। ডিবির সে সুদিন এখন আর নেই। নানা অভিযোগ ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে ডিবি। ডিবিতে এখন লিডার নেই, আছে বস!
বাবুল আক্তারের টিমের সাথে দীর্ঘদিন কাজ করা কোতোয়ালী থানার একজন উপপরিদর্শক বলেন, ‘আমাদের বিভাগের মধ্যেই সমস্যা আছে। এখন আমি যদি এগিয়ে যায়, আরেকজন বাঁধা দিবে। চাকরি নিয়ে টানাটানি হয়ে যাবে। আগে রহস্য উন্মোচনে বাবুল স্যারের নেতৃত্বে আমরা কাজ করতাম। অতিরিক্ত কমিশনার বনজ স্যার আমাদের মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকতেন। এখন সে টিম নেই। অনেকেই সিএমপি থেকে বদলী হয়েছেন। কাজের পরিবেশ আর নেই। নতুন কিছু অফিসার এসেছেন, তাদেরকে বুঝে উঠতেও পারছি না। মামলা তদন্তে তারা কিছু করতেও পারছে না। রহস্য উন্মোচনে শেষ পর্যন্ত বাবুল স্যারকেই মাঠে নামতে হবে মনে হচ্ছে।
এদিকে মিতু হত্যা মামলার তদন্তভার দেয়া হয়েছে ডিবির পরিদর্শক কাজী রাকিব উদ্দিনকে। তদন্তকারী দলকে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য্য ও ডিবি (ডিসি) মোকতার হোসেনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অথচ বিগত সময়ে বড় ধরনের ঘটনার রহস্য উন্মোচনে তাদের সাফল্য নেই। ঘটনাস্থল পড়েছে পাঁচলাইশ থানার অধীনে, এ ঘটনা নিয়ে ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদের তৎপরতাও দৃশ্যমান নয়। এর বাইরেও তদন্তে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখে হতাশ, ক্ষুব্ধ নগর পুলিশের অনেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও।
তাদের মতে, অপরাধ দমনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টিমওয়ার্ক। কিন্তু বদলীর মাধ্যমে সে টিমওয়ার্ক নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। পেশাদার অফিসারদের ক্ষমতাহীন করে ফেলা হয়েছে। মিতু হত্যার মধ্য দিয়ে, পুলিশ পরিবারের উপর হামলা চালিয়ে পুরো বাহিনীকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্তভার দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তাদের হাতে না দেওয়ায় তদন্ত একই স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ অবস্থায় বাবুল আক্তার নিজেই বাদী হওয়ার পাশাপাশি তদন্তের দায়িত্বটাও পালন করতে পারতেন তাহলে দ্রুত অপরাধী ধরা পড়তো।
তবে বাবুল আক্তারের ঘনিষ্ট চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একজন পরিদর্শক বলেন, সদ্য মা হারা দুটি বাচ্ছার- বাবা ও মা দুইজনই বাবুল স্যার। তাদেরকে বাসায় একা রেখে এখনই তিনি তদন্তে নামতে পারবেন বলে মনে হয় না। আগের মত রাতদিন বাসার বাইরে থেকে অভিযান চালানো স্যারের জন্য অনেক কঠিন হবে। তবে শত কষ্টের মধ্যে তিনি তদন্তের দায়িত্ব নিতে পারলে, রহস্য উদঘাটনে অফিসাররা নিশ্চিত আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, পুলিশে বদলী স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ বদলী হয়েছেন, কেউ এসেছেন। নতুন-পুরাতন সব অফিসারদের সমন্বয়ে তদন্ত চলছে। আশা করছি, খুব দ্রুত রহস্য উন্মোচন করতে পারবো।