বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ, চাপমুক্ত সরকার

| প্রকাশিতঃ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন


ঢাকা : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাড়ি ‘পঞ্চবটী’তে হয়ে গেল ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ। এখানেই হয়েছে হাসিনা-মোদি ও মোদি-বাইডেন বিশেষ বৈঠক। সেখানে যেন বিশ্ব নেতাদের মধ্যমণি রূপে আবির্ভূত হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সদস্য না হয়েও ভারতের আমন্ত্রণে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সম্মেলনের মঞ্চ বাংলাদেশকে দিয়েছে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা। সেইসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে কিছুদিন ধরে চলা টানাপড়েন নিরসনেও বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক জোটের এই সম্মেলন রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পাশাপাশি সাইডলাইনে সৌদি আরবের যুবরাজ, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গেও কথা হয়েছে তার। এর ফলে বাংলাদেশ অনেকটা চাপমুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। সবই এই সম্মেলনের কারণে হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই সম্মেলন থেকে ভারতও ব্যাপক লাভবান হয়েছে। এ কারণে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘ডিপ্লোম্যাসি’র পরিবর্তে লিখেছে ‘জি-২০ হলো মোদিপ্লোম্যাসি’। যার পুরো অংশজুড়েই শেখ হাসিনা। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিয়ে ‘সাইডলাইন কূটনীতি’তে পুরো আলো কেড়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি দিল্লিতে ‘গ্লোবাল সাউথের একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠ’ হিসেবেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব আনাম খানের মতে, সার্বিকভাবে বললে এ সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই প্রতিভূত হবে। ব্রিকস ও জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। বৈশ্বিক নেতৃত্বও এটি অনুধাবন করছে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেমন দৃষ্টি আছে; ঠিক তেমনি বাজার ও বাণিজ্যের দিকেও তাদের দৃষ্টি রয়েছে। সবদিক থেকেই বাংলাদেশের উত্থান ঘটেছে। একে বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্মেলনই দেখিয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সেলফি কূটনীতি’ ব্যবহার করে কীভাবে মার্কিন চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার কৌশল নিয়েছেন। তাদের মতে, শেখ হাসিনাকে তুলে ধরার জন্যই যেন এই আয়োজন করা হয়েছে। সদস্য না হয়েও পুরো সম্মেলনজুড়ে শেখ হাসিনার মূল্যায়ন। শনিবার রাতে রাষ্ট্রপতির নৈশভোজে বারবারই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে জো বাইডেনসহ বিশ্ব নেতাদের কথা বলার দৃশ্য নজর কেড়েছে।

সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের মতে, জি-২০ সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং সম্মেলনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বাংলাদেশের জন্য একটি অবিস্মরণীয় কূটনৈতিক অর্জন। পাশাপাশি দুই প্রধানমন্ত্রী একান্তে কথা বলেছেন, সেখানে ভূ-রাজনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় দিকগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সবমিলিয়ে এখানে একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বিষয় যুক্ত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই পরাশক্তিগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেক কৌশলের সঙ্গে সেই চাপগুলোকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই জায়গায় বাংলাদেশ আরো বেশি দর কষাকষি সুযোগ পেয়েছে। কারণ বাংলাদেশ শুধু জি-২০ সম্মেলনে অংশগ্রহণ বা ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকই করেনি, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বাংলাদেশ সফরে এসেছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। সব মিলিয়ে কূটনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশ যা বলেছে অন্যরাও সেই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী গ্রুপ অব টোয়েন্টি বা জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশকে অতিথি দেশ হিসেবে আমন্ত্রণ করা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ভারত বাংলাদেশকে সম্মানিত করেছে। একইসঙ্গে ভারতের অঙ্গভঙ্গি বাংলাদেশের জন্য বেশ সম্মানের বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ভারতীয় বার্তাসংস্থা এএনআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সম্মেলনের পুরো সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে উৎসাহিত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর ফলে আমরা খুব গর্বিত এবং প্রধানমন্ত্রীও (শেখ হাসিনা) উল্লেখ করেছেন, ভারত আমাদের অতিথি দেশ হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাদের সম্মানিত করেছে এবং আমরা ভারতের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের সম্মান দিয়েছে এবং একইসঙ্গে গ্লোবাল সাউথের সমস্যাগুলো উত্থাপন করার জন্য সুযোগও দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের সমস্যাগুলো উত্থাপন করে আসছে। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনে নেতা, আমরা নারীর ক্ষমতায়নে নেতা, আমরা দুর্যোগ মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী সেই বিষয়গুলোকে জি-২০ নেতৃত্বের সামনে তুলে ধরেছেন।