বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

একুশে পত্রিকার সংবাদ সত্য মেনেও সাংবাদিককে চাপ!

নোটিশে ‘মিথ্যা’, ফোনে বললেন ‘সঠিক’
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ জানুয়ারী ২০২৬ | ১২:৩৮ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়ন পরিষদে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের টাকা ভাগবাটোয়ারার সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন অভিযুক্তরা। নোটিশে প্রকাশিত সংবাদকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ দাবি করা হলেও খোদ অভিযুক্ত ইউপি সদস্য এবং তাদের স্বজনদের একাধিক অডিও রেকর্ড উল্টো চিত্রই তুলে ধরছে। সর্বশেষ আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালেও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য ফোনে সংবাদের সত্যতা স্বীকার করে প্রতিবেদকের কাছে তথ্যদাতার (সোর্স) নাম জানতে চেয়ে চাপ সৃষ্টি করেছেন।

সেখানে দেখা যায়, অভিযুক্তরা কেবল অনিয়মের কথা স্বীকারই করেননি, বরং সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিবেদককে ‘ম্যানেজ’ করা এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অবস্থান জানার চেষ্টাও চালিয়েছেন।

গত ১১ জানুয়ারি একুশে পত্রিকায় “আনোয়ারায় সরকারি টাকা লুটের ‘খোলামেলা’ স্বীকারোক্তি” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বরুমছড়া ইউনিয়নের ‘ওয়ান পার্সেন্ট’ বরাদ্দের ৬ লাখ টাকার দুটি প্রকল্প থেকে ২ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। এর প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার বরুমছড়া ইউপি সচিব পরিতোষ গুহ, ইউপি সদস্য রুমা আক্তার ও মো. শরীফের পক্ষে অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ হুসাইন আল মাহমুদ একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। নোটিশে দাবি করা হয়, প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় দুর্নীতির সুযোগ নেই এবং সংবাদটি অসাধু উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে একুশে পত্রিকার হাতে আসা একাধিক কল রেকর্ড এবং দালিলিক প্রমাণ নোটিশের এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, লিগ্যাল নোটিশে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করা হলেও, সংবাদ প্রকাশের আগে ও পরে অভিযুক্তদের কথোপকথন সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে। অভিযুক্ত ইউপি সদস্য রুমা আক্তারকে প্রতিবেদক জিন্নাত আয়ুবকে ফোন করে লিগ্যাল নোটিশের বক্তব্যে থাকা অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন করলে একপর্যায়ে তিনি প্রকাশিত সংবাদটি ‘সঠিক’ মেনে নিলেও উত্তেজিত হয়ে প্রতিবেদককে জেরা করতে থাকেন—কে তাকে এই গোপনীয় তথ্য দিয়েছে। ফোনে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি সারা জীবন এই নাম খুঁজব, কে আপনাকে তথ্য দিয়েছে।’ লিগ্যাল নোটিশে সংবাদটিকে ‘মিথ্যা’ দাবি করার পর, ফোনে নিজেই সংবাদের সত্যতা স্বীকার করে সোর্সের নাম জানতে চাওয়া অভিযুক্তদের দ্বিমুখী আচরণের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

এর আগে সংরক্ষিত আরেকটি অডিও রেকর্ডে এই ইউপি সদস্য রুমা আক্তারকে স্পষ্টভাবে টাকার হিসাব দিতে শোনা যায়। তিনি সেখানে বলেন, ‘এক লাখ টাকা খরচের বাবদ লাগছে। সচিব রাখি দিছে।’ ওই কথোপকথনে তিনি আরও স্বীকার করেন যে, বাকি টাকা দিয়ে তারা সবাই মিলে আসবাবপত্র কেনাকাটা করবেন। লিগ্যাল নোটিশে যেখানে দাবি করা হয়েছে কাজ স্বচ্ছভাবে হচ্ছে, সেখানে খোদ ইউপি সদস্যের এমন বক্তব্য নোটিশের আইনি ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এদিকে সংবাদটি প্রকাশের পর প্রতিবেদক জিন্নাত আয়ুবের ওপর নানাভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং প্রচ্ছন্ন হুমকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। জিয়াউর রহমান জিয়া নামের এক ব্যক্তি নিজেকে রুমা আক্তারের ভাই এবং বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি ফোনে স্বীকার করেন যে তার বোন (রুমা আক্তার) প্রতিবেদকের কাছে সত্য কথাই বলেছেন। জিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি ভাই হিসেবে আপা আপনার কাছে সত্যটা বলেছে আর কি। এতে কী সমস্যা আছে?’ অভিযুক্তের ভাইয়ের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য শতভাগ সত্য ছিল।

ঘটনা এখানেই থামেনি। আহমদ নূর ও নিজাম নামের আরও দুই ব্যক্তি বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদক জিন্নাত আয়ুবকে একাধিকবার ফোন করেন। তারা প্রতিবেদকের অবস্থান জানতে চাওয়া এবং বারবার ‘সরাসরি দেখা করার’ জন্য চাপ দিতে থাকেন। নিজাম নিজেকে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করে জানান, ওই ইউনিয়নের দুর্নীতির বিষয়ে তিনিও এর আগে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। অথচ একই ব্যক্তি ফোনে প্রতিবেদককে ‘সহযোগিতার’ নাম করে দেখা করতে চাপ দেন। আহমদ নূর ফোনে কোনো তথ্য না দিয়ে বারবার প্রতিবেদকের অবস্থান জানতে চান, যা সংবাদকর্মীর নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

একুশে পত্রিকার আনোয়ারা-কর্ণফুলী প্রতিনিধি জিন্নাত আয়ুব জানান, সংবাদ প্রকাশের পর থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। প্রথমে তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করে, তাতে ব্যর্থ হয়ে এখন আইনি নোটিশের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল নিয়েছে। আজ সকালেও ইউপি সদস্য রুমা আক্তার ফোন করে তথ্যদাতার নাম জানতে চাপ দিয়েছেন এবং পরোক্ষ হুমকি দিয়েছেন। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

জিন্নাত আয়ুব বলেন, ‘আমার কাছে অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি, তাদের স্বজনদের সত্যতা নিশ্চিতকরণের রেকর্ড এবং আমাকে চাপ দেওয়ার সব প্রমাণ সংরক্ষিত আছে। তারা যদি আইনি পথে হাঁটতে চান, তবে এই প্রমাণগুলোই আদালতে তাদের দুর্নীতির দালিলিক সাক্ষ্য হিসেবে হাজির করা হবে।’

আইনজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা বা পরিকল্পনা করা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ এবং দুর্নীতির শামিল। লিগ্যাল নোটিশে ‘কাজ চলমান’ বলে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তা অডিও রেকর্ডে থাকা ‘টাকা ভাগের স্বীকারোক্তির’ সামনে ধোপে টেকে না। উপরন্তু, সত্য সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া বা সোর্সের নাম জানতে চাওয়া ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

এদিকে নোটিশের দ্বিতীয় পাতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “উভয় প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান আছে” এবং “প্রকল্পদ্বয়ের কাজ এবং মেয়াদ এখনো সমাপ্ত না হওয়ায় কোনো প্রকার পূর্ণাঙ্গ ব্যয়ের হিসাব বিবরণী প্রণয়ন করা হয়নি”। এটি দুর্নীতির অভিযোগ খণ্ডন করার জন্য একটি অত্যন্ত দুর্বল যুক্তি। কারণ, কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অর্থ উত্তোলন বা ভাগবাটোয়ারা হওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। একুশে পত্রিকার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, অডিও রেকর্ড আছে, তাই “কাজ শেষ হয়নি তাই দুর্নীতি হয়নি”—এই যুক্তিটি সঠিক নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ছিল না।

এছাড়া নোটিশে দাবি করা হয়েছে যে, স্থানীয় কিছু “অসাধু ব্যক্তির অনৈতিক দাবি পূরণ করিতে না পারায়” তারা এবং প্রতিবেদক যোগসাজশ করে এই সংবাদ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নোটিশে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি সেই “অসাধু ব্যক্তিরা” কারা, তাদের দাবিটি কী ছিল, বা কখন এই দাবি করা হয়েছিল। আইনের দৃষ্টিতে সুনির্দিষ্ট নাম বা ঘটনা ছাড়া এমন ঢালাও অভিযোগ সাধারণত ভিত্তিহীন হিসেবে গণ্য হয় এবং এটি মূল অভিযোগ (দুর্নীতি) থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর একটি দুর্বল কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই বিষয়ে একুশে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী। প্রকাশিত সংবাদের প্রতিটি তথ্যের সপক্ষে তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে এসব প্রমাণাদি ও আরও অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য উপস্থাপন করে অধিকতর তদন্তের দাবি জানানো হবে। অভিযুক্তরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করলে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ।