শংকর চৌধুরী, খাগড়াছড়ি :শান্তিচুক্তির কেটে গেলো দীর্ঘ ২০ বছর। কিন্তু এখনো এই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের যেন শেষ নেই।
দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে পাহাড়ে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে হাজারও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। শরণার্থীদের দেশে এনে নিজ বাস্তুভিটা ফেরত দেয়াসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষরিত হয় এই চুক্তি। শরণার্থীরা দেশে ফিরলেও ফেরত পাননি নিজ বাস্তুভিটা। এতে করে হতাশা বাড়ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৯৮ সালের ২০ জানুয়ারী গঠিত হয়, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন টাস্কফোর্স। এর আগে ২০ দফা প্যাকেজ শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ১৯৯৭ সালের ২৮ মার্চ প্রথম দফায় ৫ হাজার ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসনের কাজ শুরু হয়। ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তিতে বাস্তুভিটা ফেরতসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে ১২ হাজার ২শ ২২ পরিবারের ৬৪ হাজার ৬১২ জন শরণার্থীকে ফেরত আনা হয় দেশে। ২০ দফা প্যাকেজে শরণার্থীদের নিজ বাস্তুভিটা পুনর্বাসন, রেশন সুবিধা, চাকরি ফেরত ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি প্রদানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দীর্ঘ ২০ বছরেও শরণার্থীদের নিজ ভিটা জমি ফেরত না দিয়ে খণ্ড খণ্ডভাবে সরকারি খাসভূমিতে কিছু সংখ্যক শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা হলেও সহায় সম্বলহীনভাবে দিন কাটাচ্ছে ভারত প্রত্যাগতরা।
দীঘিনালা বন বিহার সংলগ্ন এলাকার ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী বিমলেন্দু চাকমা বলেন, তিন বছর ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে ঘরে বসে আছি। কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। সরকার যে রেশন দেয় সেটি নিয়মিত না পাওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
বিমল কান্তি চাকমা বলেন, চুক্তিতে শরণার্থীদের চাকরি পুনর্বহালের ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি প্রদানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও আমরা সে সুবিধা পাচ্ছি না। এছাড়া ভূমি জটিলতা সমাধান না হওয়ায় দীর্ঘ ২০ বছরেও ভূমি ফেরত পাইনি আমরা।
অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসার চলে না, মাঝে মধ্যে না খেয়ে থাকতে হয়। অশ্রুসিক্ত চোখে কথা গুলো বলছিলেন, গৌরি চাকমা। গৌরি আরো বলেন, ‘৮৬ সালে বাবার সাথে ৩ ভাই ও ১ বোন মিলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নিই। চুক্তির পর জায়গা জমি ফেরতসহ বিভিন্ন শর্তে আমাদের দেশে ফেরত আনা হয়। কিন্তু সেসব শর্তের মৌলিক বিষয়গুলো থেকে এখনো বঞ্চিত আমরা।
ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী) যতীন্দ্র লাল ত্রিপুুরা বলেন, ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তির মৌলিক ধারাসমূহের অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এ সরকারের মেয়াদেই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধি প্রবিধান প্রণয়ন করে সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সূত্র জানা যায়, পঞ্চদশ সংশোধনীতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনের পর সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ২৩ হাজার ৮৬০ টি আবেদন আসে কমিশনে। দুই দশকেও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধি, প্রবিধান প্রণয়ন না হওয়ায় কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। দ্রুত কমিশনকে কার্যকর করে ভূমি সমস্যা সমাধানের দাবি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা সমর্থীত) কেন্দ্রীয় সভাপতি সুধা সিন্ধু খীসা বলেন, সরকার পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর সাথে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তামাশা করছে। এতে করে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীরা আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুইযুগ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।