
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী আসন বৃদ্ধি, এবং সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার প্রথম বৈঠকে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল কাছাকাছি মতামত দিয়েছে। তবে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ও কার্যপরিধি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। মঙ্গলবার (৩ জুন) রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এই বিষয়ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা জানান, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল, আস্থাভোট ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক দলই একমত পোষণ করেছে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এই অনুচ্ছেদকে ‘ফ্যাসিস্টিক’ আখ্যা দিয়ে এর বিলোপ বা জরুরি সংস্কারের দাবি জানান। তিনি আস্থাভোট ও অর্থবিলেও সদস্যদের দলের বিপক্ষে ভোটের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আস্থাভোট ও অর্থবিল ছাড়া অন্য বিষয়ে সদস্যদের দলের বিপক্ষে ভোটের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে, তবে সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন বলে মনে করে।
সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সভাপতির সংখ্যা নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়। বেশিরভাগ দল ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করার পক্ষে মত দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রধানও বিরোধী দল থেকে করার প্রস্তাব আসে। জামায়াতে ইসলামী পাবলিক অ্যাকাউন্টস, পাবলিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং (সম্ভবত পাবলিক আন্ডারটেকিংস) ও প্রিভিলেজ কমিটির মতো মৌলিক কমিটিগুলো বিরোধীদলীয় এমপিদের মধ্য থেকে এবং বাকি কমিটিগুলোতেও আনুপাতিক হারে বিরোধী দলের চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব দেয়, যেখানে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বিরোধী দল থেকে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি অবশ্য সংসদের সকল স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে বিরোধী দলকে দেওয়া যেতে পারে।
সংসদে নিম্নকক্ষে নারী আসন ২৫ শতাংশ বা ১০০টি করার বিষয়ে অধিকাংশ দল ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। বিএনপি ১০০টি সংরক্ষিত নারী আসনের সুপারিশ করলেও এর নির্বাচন পদ্ধতি কী হবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি বলে জানায়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সরাসরি ভোটে ১০০ নারী সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিরও প্রস্তাব করেছে।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটিকে কোনো দলই সরাসরি বিরোধিতা করেনি। তবে এর মেয়াদ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। বিএনপি সর্বোচ্চ তিন মাসের প্রস্তাব করলেও এনসিপি চার মাস এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) পাঁচ মাসের সুপারিশ করেছে।
বৈঠকের শুরুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব চূড়ান্ত নয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই জাতীয় সনদ রচিত হবে। তিনি জানান, সব বিষয়ে ঐকমত্য না হলে সেগুলো সনদে অন্তর্ভুক্ত হবে না, দলগুলো তা নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে রাখতে পারবে। জনগণের কাছে কমিশনের কার্যক্রম স্বচ্ছ করতে দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় সনদ তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানান। আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিশনের সদস্যদের মধ্যে বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যরা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণসংহতি আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), খেলাফত মজলিস, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সহ প্রায় ৩০টি দল ও জোট।