বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

যাত্রী আছে, পণ্য নেই: হাজার কোটি টাকার কক্সবাজার রেলপথে ‘আয়ের দুর্ভিক্ষ’

১১ হাজার কোটির রেলপথ: কর্মকর্তাদের ‘চাহিদা নেই’ অজুহাতে সড়কে ঝরছে প্রাণ
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৫ জুলাই ২০২৫ | ৯:৪৩ পূর্বাহ্ন


ঝিকঝিক শব্দ তুলে সবুজ পাহাড় আর গ্রামীণ জনপদ পেরিয়ে দেশের প্রথম আইকনিক রেলস্টেশনে এসে থামে ট্রেন। এ যেন এক রূপকথার যাত্রা! ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পর্যটকদের জন্য এই স্বপ্নযাত্রা সত্যি হয়েছে প্রায় দেড় বছর। কিন্তু এই ঝকঝকে ছবির অপর পিঠে লুকিয়ে আছে এক বিশাল আক্ষেপ আর অর্থনৈতিক লোকসানের গল্প।

১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই রেলপথে যাত্রীর আনাগোনা থাকলেও, নেই পণ্যের কোলাহল। লবণ, মাছ, শুঁটকি কিংবা সুপারির গন্ধমাখা কোনো কার্গো ট্রেন এই পথে চলেনি আজও। ফলে, যে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তা এখন পর্যন্ত প্রহসনই রয়ে গেছে।

প্রকল্প নেওয়ার সময় রেলওয়ে কর্তারা শুনিয়েছিলেন সোনালি স্বপ্নের কথা। বলা হয়েছিল, এই রেলপথ চালু হলে বছরে আয় হবে ৪৪২ কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু পণ্য পরিবহন করেই আসবে ৫০ কোটি। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও পণ্যবাহী ট্রেন তো দূরের কথা, যাত্রীবাহী ট্রেনেও একটি লাগেজ ভ্যান পর্যন্ত যুক্ত হয়নি। ফলাফল? প্রথম বছরে লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ মাত্র ৮০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। পণ্য পরিবহন থেকে আয় একবারে শূন্য! হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ যেন এখন রেলওয়ের জন্যই এক বিরাট বোঝা।

সড়কপথের কান্না: লবণাক্ত পানিতে পিচ্ছিল মৃত্যুফাঁদ

রেল যখন ‘চাহিদা নেই’ বলে ঘুমাচ্ছে, তখন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সরু মহাসড়ক যেন এক মৃত্যুফাঁদ। দেশের সিংহভাগ লবণ এই কক্সবাজার থেকেই ট্রাকে করে সারা দেশে যায়। আর সেই লবণবাহী ট্রাক থেকে চুইয়ে পড়া পানিতে পিচ্ছিল হয়ে থাকে রাস্তা। ফলাফল—ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়ায় তিনটি দুর্ঘটনায় ঝরে যায় ১৬টি তাজা প্রাণ! পুলিশ আর সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আর এই লবণাক্ত পানিই দুর্ঘটনার মূল কারণ। অথচ এই লবণ যদি ট্রেনে যেত, তাহলে হয়তো এই প্রাণগুলো বেঁচে যেত, বহু পরিবারকে পথে বসতে হতো না।

সম্ভাবনার সাগরে ঢেউ নেই

শুধু লবণ নয়, কক্সবাজারের সম্ভাবনার সাগর যেন পুরোটাই অব্যবহৃত রয়ে গেছে রেলের কাছে। বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন মাছ, শত শত কোটি টাকার শুঁটকি আর সারা দেশে কদর পাওয়া সুপারি—সবই আজও পরিবহনের জন্য তাকিয়ে থাকে অনিরাপদ আর ব্যয়বহুল ট্রাকের দিকে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা প্রথম দিন থেকেই একটা পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য আবেদন করে আসছি। এটা হলে আমাদের ব্যবসা যেমন সহজ হতো, তেমনি মহাসড়কের ওপর চাপও কমত। কিন্তু আমাদের কথা শোনার যেন কেউ নেই।”

কর্তাদের দায় ঠেলাঠেলি: ‘চাহিদা নেই’ বনাম ‘উদ্যোগ কই?’

তাহলে ভুলটা কোথায়? রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ বলছে, কক্সবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নাকি পণ্য পরিবহনের কোনো ‘চাহিদা’ পাওয়া যায়নি! আবার ইঞ্জিন সংকটের পুরনো অজুহাত তো আছেই। পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সাফ জানিয়ে দিলেন, “আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। চাহিদা দিলে বিবেচনা করা হবে।”

কিন্তু তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন প্রকল্পটির পরিচালক ও রেলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সবুক্তগীন নিজেই! তিনি বলছেন, “চাহিদা নেই, কথাটা ঠিক নয়। আমরা দুটি লাগেজ ভ্যান যুক্ত করার পরিকল্পনা করছি। বাণিজ্যিক বিভাগের সঙ্গে কথা বলব।”

রেলওয়ের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে পরিষ্কার, উদ্যোগ আর সমন্বয়ের অভাবেই বিশাল সম্ভাবনার এই প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। একদিকে ‘চাহিদা নেই’ বলে দায় এড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে ‘উদ্যোগ নেওয়া হবে’ বলে পার করা হচ্ছে সময়। মাঝখান থেকে লোকসান গুনছে রাষ্ট্র, আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন ব্যবসায়ীরা। এখন প্রশ্ন হলো, এই ঘুম ভাঙবে কবে?