২৭ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, বুধবার

ওমর গণি এমইএস কলেজে অচলাবস্থা কাটছেই না

প্রকাশিতঃ শনিবার, জুন ১, ২০১৯, ৫:০৫ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের বেসরকারি ওমরগণি এমইএস কলেজে তিন মাস ধরে শিক্ষক-কর্মচারীরা কলেজের অভ্যন্তরীণ বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার, উপাধ্যক্ষ ও এমপিও শিক্ষকদের সঙ্গে ননএমপিও শিক্ষকদের বিরোধ-দ্বন্ধ থেকে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিনেও অচলাবস্থা দূর হচ্ছে না।

জানা গেছে, কলেজের এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারী অনুদান ও কলেজ অভ্যন্তরীণ তহবিল- দুই জায়গা থেকে বেতন-ভাতার সুবিধা ভোগ করে থাকেন। কিন্তু ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা একমাত্র উৎস কলেজ তহবিল থেকেই বেতন-ভাতা পান। সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে কলেজ অভ্যন্তরীণ বেতন-ভাতা বন্ধ করে রাখেন বলে অভিযোগ। তবে এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারী অনুদান পেয়ে যাচ্ছেন যথাসময়ে।

ওমর গণি এমইএস কলেজের বেতন-ভাতার বিলে (কলেজ অভ্যন্তরীন তহবিল) আগে কখনো পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের অনুমোদন নেয়া হত না। চলতি বছর থেকে যখন সেই বিধান চালু করা হয়। এবং ননএমপিও শিক্ষকদের বিভিন্ন ভাতাদি থেকে বঞ্চিত করা সংক্রান্ত বিষয়ে সভাপতি বরাবরে আবেদন জানানো হয়। তখনই এমপিও শিক্ষকদের বিভিন্ন অনিয়ম সভাপতির নজরে আসে।

জানা যায়, ওমর গণি এমইএস কলেজের সকল এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী এবং কেবলমাত্র তিনজন ননএমপিও কর্মচারী মূল বেতনের ২০ শতাংশ নগর ভাতা, ৩০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকে উত্তোলন করছেন; ১৯৯২ সাল থেকে। এ জাতীয় ভাতাদির সুবিধা থেকে তিনজন ছাড়া বাকি ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা বঞ্চিত।

ননএমপিও শিক্ষকদের অভিযোগ, সরকারের দেয়া ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট সুবিধার পাশাপাশি গত বছরের জুন-জুলাই থেকে কলেজ অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকেও ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট সুবিধা নিয়ে আসছেন এমপিও শিক্ষকরা। কিন্তু একই ব্যাক্তি একই আর্থিক সুবিধা দুই জায়গা থেকে নিতে পারবেন না; বিষয়টি সম্পুর্ণ বিধিবহির্ভূত ও অন্যায় বলছেন ননএমপিও শিক্ষকরা।

জানা গেছে, এমপিও শিক্ষকদের মনগড়া ও নিয়মবহির্ভূত খাত (নগর ভাতা ২০ শতাংশ, মহার্ঘ্য ভাতা ৩০ শতাংশ, সিনিয়রিটি ভাতা) স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি দুই উৎস থেকে তাদেরকে মোট ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট সুবিধা না দিয়ে বিধিসম্মতভাবে কলেজ অভ্যন্তরীন ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট সুবিধা বন্ধ রাখা হয়। এবং সরকারী অনূদানের ইনক্রিমেন্ট সুবিধা গ্রহণ এবং জুন-জুলাই থেকে গ্রহণ করা ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পুরো টাকা ফেরত নেয়ার জন্য পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার কঠোরভাবে নির্দেশ দেন।

তবে উক্ত খাত থেকে প্রাপ্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার ও এমপিও শিক্ষকরা লিখিত আবেদন করলেও বিভাগীয় কমিশনার উক্ত খাতগুলো বন্ধ করার ব্যাপারে অনঢ় থাকেন এবং বিধিসম্মতভাবে হবে বলে জোর দেন। কিন্তু বিগত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার বিভাগীয় কমিশনারের দিকনির্দেশনা অনূযায়ী অবৈধ খাত বা বিষয়গুলো পরিহার করে বেতন বিল (কলেজ অভ্যন্তরীণ তহবিল) প্রস্তুতকরণে তালবাহানা করে আসছিলেন। ফলে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের বেতন ভাতা প্রদানের কাজটি হচ্ছিল না। তবে একপর্যায়ে এমপিও শিক্ষকদের কেবলমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসের কলেজ অভ্যন্তরীণ বেতন উল্লিখিত ‘অবৈধ ভাতাসহ’ প্রদানের বিষয়টি সভাপতি বিবাচনা করেন।

কিন্তু সভাপতির নিষেধ সত্ত্বেও অবৈধ ভাতাসহ শুধু এমপিওদের মার্চ মাসের বেতন বিল উপস্থাপন করেন তখনকার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার। যার কারণে রমজান এবং সামনে ঈদ- এমতাবস্থায় বেতনহীন ননএমপিও শিক্ষক কর্মচারীরা পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। কলেজ অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ থাকলেও এমপিও শিক্ষকরা প্রতি মাসে তাদের সরকারী অনুদান ঠিকই পেয়ে যাচ্ছন। শুধু তাই নয় বিগত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অবহেলার কারণে এ বছরের বৈশাখী ভাতা (কলেজ অভ্যন্তরীণ তহবিল) প্রদান বিলম্বিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সভাপতির কোন প্রকার অনুমোদন ছাড়াই গত ১০ এপ্রিল কলেজের বিগত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার তিনজন ননএমপিও কর্মচারী ছাড়া বাকী সকল ননএমপিও কর্মচারী এবং অতিথি শিক্ষকদের ফ্রেব্রুয়ারি মাসের বেতন অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান করেন; বিষয়টি সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বোর্ড পরীক্ষা কমিটিতে কেবলমাত্র এমপিও শিক্ষকরা দায়িত্বভার গ্রহণ করে প্রায় সারা বছরই মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। কলেজ রেজুলেশন অগ্রাহ্য করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার জ্যেষ্ঠ ননএমপিও শিক্ষকদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এমপিও জুনিয়র শিক্ষকদের মর্যাদা দিয়ে ননএমপিও শিক্ষকদের মর্যাদাহানী করেছেন।

ননএমপিও শিক্ষকদের আবেদন উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা কমিটিতে গণিত বিভাগের প্রভাষক আবু নঈম মোহাম্মদ ইব্রাহীম চৌধুরীকে একাধারে পাঁচ বছর রাখা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগও রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল উক্ত কলেজে পরীক্ষা কমিটি প্রশ্নপত্র দেরীতে আনায় চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনের একটি পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে ২০ মিনিট পর শুরু হয়।

ওমর গণি এমইএস কলেজে গনিত ও ইংরেজী বিভাগে এমপিও মহিলা কোটা না থাকা সত্ত্বেও জান্নাতুল নাঈম এবং সামিনা ইয়াসমিন- এই দু’জনকে মেধা তালিকায় পুরুষ প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে মহিলা কোটা দেখিয়ে এমপিও করা হয় বলেও অভিযোগ। ইংরেজী বিভাগে ননএমপিও পুরুষ শিক্ষকরা মেধাতালিকায় থাকা সত্ত্বেও মহিলা কোটা দেখিয়ে অকৃতকার্য সামিনা ইয়াসমিনের এমপিও করা হয়। উল্লেখ্য, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার সময় মহিলা কোটা উল্লেখ ছিল না। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী মহিলা কোটা থাকলে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলা ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে এমপিও নিয়োগের সময়ও মহিলা কোটার বিষয়টি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল না, যা বিধিবহির্ভূত। ফলে বাংলা বিভাগের ননএমপিও শিক্ষক গোফরানসহ অন্যান্য পুরুষ প্রার্থী মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকলেও অনেক পিছিয়ে থাকা অনিন্দিতা দেবনাথের এমপিও হয়।

ওমর গণি এমইএস কলেজে এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা সরকারী অনুদানের পাশাপাশি অবৈধ বিভিন্ন খাত দেখিয়ে বছরের পর বছর ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের বঞ্চিত করে আসছেন বলে অভিযোগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একজন ননএমপিও শিক্ষক বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এমপিও শিক্ষকরা শাসক শ্রেণিতে এবং ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা শোষিত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছেন। এ কারণে কলেজটিতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এমপিও শিক্ষক বলছেন, কলেজ পরিচালনা কমিটি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ডিঙিয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তারা বিরোধিতা করায় ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভাতা ছাড়া বেতন নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিন মাস ধরে কলেজটি সব শিক্ষকের কলেজ প্রদত্ত বেতন বন্ধ।

কলেজটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের সুপারিশে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তহমিনা আখতার। এদিকে বেতন নিয়ে জটিলতার মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কক্ষে শিক্ষকদের মধ্যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে খুলশী থানায় পাল্টাপাল্টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ওমরগণি এমইএস কলেজের নতুন অধ্যক্ষ আ.ন.ম সরোয়ার আলম সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি যোগদান করার পরপরই কলেজে ঈদ উপলক্ষে ছুটি হয়ে যায়। যার কারণে বেতন-ভাতা নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরী হয়েছে তা সমাধানে তেমন কাজ করতে পারিনি। এই সমস্যাটা দিনে দিনে সমাধান করা সম্ভব নয়, তবে চেষ্টা চলছে। বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ও আন্তরিক, সমস্যাটা সমাধান করার জন্য।