
চট্টগ্রাম: নিয়ম অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য যদি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে উপ-উপাচার্যকে রুটিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে যান। উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন উপাচার্য নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তাকে রুটিন দায়িত্ব পালন করে যেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দায়িত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু এ দায়িত্ব কোনভাবেই উপাচার্যের দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হবে না। এমনকি তিনি ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যও নন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হাবিবুর রহমান এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, রুটিন দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় উপ-উপাচার্য কোন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। বড় কোন প্রজেক্টের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না তিনি। অভ্যন্তরীণ বদলি, নিয়োগ ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে তাঁর কোন এখতিয়ার নেই। শুধুমাত্র অন্য কোন জরুরী বিষয় থাকলে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। দৈনন্দিন কাজের বাইরে যদি উনি কোনো সিদ্ধান্ত নেন তাহলে তা আইন পরিপন্থী এবং অকার্যকর হবে।
তিনি আরো বলেন, সাধারণত স্বল্প সময়ের জন্য রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরমধ্যে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের মেয়াদ ১৪ জুন অপরাহ্ন পর্যন্ত রয়েছে। এরপর থেকে উপ-উপাচার্য প্রফেসর শিরীণ আখতারকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত রুটিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপাচার্য পদে বা ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য পদে তাঁকে নিয়োগ দেয়া হয়নি।
কিন্তু এসব নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরাসরি উপাচার্য পদে যোগদান করেছেন প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার। এমনকি উপাচার্য হিসেবে যোগদানপত্রে স্বাক্ষরও করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটিকে নজিরবিহীন ঘটনা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। উপাচার্যের মেয়াদ ১৪ জুন শেষ হলেও ১৩ জুন উপ-উপাচার্য প্রফেসর শিরীণ নিজেকে উপাচার্য হিসেবে উপস্থাপন করে যোগদান করায় বিষয়টি গড়িয়ে যেতে পারে এখন আইন-আদালত পর্যন্ত। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দায়িত্ব ও এখতিয়ার সম্পর্কে ধারণা না থাকায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রফেসর ড. শিরীণ বিশ্ববিদ্যালয়কে জটিলতায় ফেলতে পারেন বলেও আশংকা প্রকাশ করছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
অবাক করা বিষয় হল, ১৪ জুন রাত পর্যন্ত প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী উপাচার্য পদে থাকার পরও প্রফেসর শিরীণ আখতার উপাচার্যের জন্য বরাদ্দকৃত পাজেরো গাড়িটি ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন। ১৩ জুনই তিনি পরিবহন দফতরকে উপাচার্যের গাড়িটি তাঁর ব্যবহারের জন্য পাঠাতে বলেন৷
এদিকে গত ১৩ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা যোগদানপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১৩/০৬/২০১৯ খ্রিঃ তারিখের শিম/শা: ১৮/৯ চ:বি:-১/২০০৬/১৭৫ নম্বর প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে আপনার সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানানো যাচ্ছে যে আমি অদ্য ১৩/০৬/২০১৯ তারিখ অপরাহ্নে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি।’
যোগদানপত্রের নিচের অংশে শিরীণ আখতার লিখেছেন, ‘আপনারই একান্ত, প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার, উপাচার্য।’ অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপরোক্ত স্মারক নম্বরের চিঠিতে তাঁকে রুটিন দায়িত্ব পালনের জন্য বলা হয়েছে। তাঁকে উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণের কোনো নির্দেশনা এতে উল্লেখ করা হয়নি। এরপরও নিজের নামের সঙ্গে তিনি ‘উপাচার্য’ শব্দটি যুক্ত করেছেন।
এদিকে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে, সে প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩ এর ১৪(১) ধারা অনুযায়ী শর্তগুলো উল্লেখ থাকে। প্রজ্ঞাপনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের আদেশক্রমে- কথাটি উল্লেখ থাকে। এতে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যকে চার বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করার বিষয়টিও উল্লেখ থাকে। বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও এতে উল্লেখ থাকে। ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারকে উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগের প্রজ্ঞাপনেও এসব বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না পেয়ে ওই পদে যোগদানের বিষয়টি নিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। রুটিন দায়িত্বের বিষয়টি বুঝতে না পারার কিছু নেই। কোনো থানার ওসি যদি ছুটিতে থাকেন বা তাৎক্ষণিক বদলি হোন তাহলে থানার কার্যক্রম দেখভাল করার দায়িত্ব বর্তায় ওই থানার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শকের। তিনি কিছুতেই নিজেকে ওসির চেয়ারে আসীন করতে পারেন না। চবি উপ-উপাচার্যকে দেওয়া রুটিন দায়িত্বের বিষয়টিও একই।
তারা আরো বলেন, উপাচার্য পদে নিয়োগ না পেয়ে ওই পদে যোগদান করা অবৈধ। এর মাধ্যমে প্রফেসর শিরীণের প্রশাসনিক অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এ বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা উচিত। আদালতের নজরে আনলে প্রফেসর শিরীণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ডিন বলেন, প্রফেসর শিরীণ অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিভাগের চেয়ারম্যানও ছিলেন না। তিনি ডিন, প্রভোস্ট, সিন্ডিকেট, সিনেট সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে তার মধ্যে প্রশাসনিক অদক্ষতা, অজ্ঞতা থাকাই স্বাভাবিক। তাই রুটিন দায়িত্বের চিঠি পেয়ে তিনি নিজেকে উপাচার্য পদে যোগদান করিয়েছেন। নিজে নিজে উপাচার্য হয়ে যাওয়ার নজির দেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা।
তিনি আরো বলেন, উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার আগেই তিনি এ পদে যোগদান করার ফলে তাঁর মধ্যে যে অবৈধ ক্ষমতা চর্চার প্রবণতা রয়েছে তা প্রমাণিত হল।
এ বিষয়ে কথা বলতে চবি উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের মোবাইলে শুক্রবার সকাল থেকে এ প্রতিবেদন লিখা পর্যন্ত একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।