বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

মামলা নিয়ে সওদা করেন পেশকার নুর মোহাম্মদ !

| প্রকাশিতঃ ১৪ অক্টোবর ২০১৬ | ২:৫৩ পূর্বাহ্ন

screenshot_5মামুনুল হক চৌধুরী : নুর মোহাম্মদ। পেশায় পেশকার হলেও আদালতপাড়ায় তার পরিচয় নুর মোহাম্মদ সওদাগর। কারণ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে মামলা নিয়ে বাণিজ্য করাই হচ্ছে তার মূল পেশা। চট্টগ্রামের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী বা পেশকার হিসেবে কর্মরত আছেন দীর্ঘদিন ধরে। তার ঘুষ-বাণিজ্যে অতিষ্ঠ মামলার বাদী-বিবাদী, আইনজীবী এমনকি আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অতিষ্ঠরা নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির কাছে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন। চট্টগ্রাম আদালতে আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার বিরুদ্ধে রেজুলেশনও করেছে। কিন্তু নুর মোহাম্মদ বরাবরই থাকেন বহাল তবিয়তে, চালিয়ে যান ‘সওদাগিরি’।

আদালত সূত্রে জানা যায়, সদ্য বিদায়ী জেলা জজ মো. নুরুল হুদা চট্টগামে জেলা জজ হিসেবে যোগদানের পূর্বও দুইবার চট্টগ্রামে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময়ে বিচারক মো. নুরুল হুদার বেঞ্চ সহকারী ছিলেন নুর মোহাম্মদ। ওই সময়ে বেঞ্চ সহকারী নুর মোহাম্মদের সাথে বিচারক মো. নুরুল হুদার সখ্যতা গড়ে উঠে। ফলে ২০১৫ সালের জানুয়ারীতে বিচারক মো. নুরুল হুদা চট্টগ্রামের জেলা জজ হিসেবে যোগ দেন। যোগদানের ১৫ দিনের মাথা নুর মোহাম্মদকে ফটিকছড়ি সহকারী জজ আদালত থেকে বদলী করে প্রথম যুগ্ন জেলা জজ আদালতের পেশকার হিসেবে নিযুক্ত করেন জেলা জজ মো. নুরুল হুদা। এর আগে দুর্নীতি ও বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ উঠায় ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে তাকে ফটিকছড়ি বদলি করা হয়।

পেশকার নুর মোহাম্মদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জাহেদ বিরু বলেন, ‘নুর মোহাম্মদের দৌরাত্ম্যে আমরা ত্যক্ত-বিরক্ত। মামলার তারিখ দেরিতে কিংবা তাড়াতাড়ি ফেলার কথা বলে বাদী-বিবাদীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেন তিনি। জেলা আইনজীবী সমিতির আগের কমিটি তার বিরুদ্ধে একটি রেজুলেশন পাশ হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে প্রতিদিন অভিযোগের স্তূপ হচ্ছে। সম্প্রতি বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চট্টগ্রাম আদালত পরিদর্শন আসলে তাকেও আমরা এ ব্যাপারে জানিয়েছি। শিগগিরই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বিচারপতি মঈনুল ইসলাম।’

আদালতপাড়ার আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, মামলার শুনানির তারিখ দেরিতে কিংবা তাড়াতাড়ি দেওয়ার তদবির করার নাম করে তিনি মামলাপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। গত ২০১৫ সালের মে মাসে মোঃ শামসুল আলম ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত থেকে তার দায়ের করা মামলাটি অন্য যে কোনো আদালতে নেওয়ার জন্য মিছ মামলা করেন। বাদী তার আবেদনে বলেন, ‘মামলার তারিখ তাড়াতাড়ি ফেলার তদবিরের কথা বলে পেশকার নুর মোহাম্মদ বাদীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা দাবি করে। ফলে বাদী সুবিচার পাওয়ার জন্য মামলাটি অন্য কোনো আদালতে নেওয়ার দাবি জানান।’

আদালত সূত্র জানায়, মামলার তারিখ নিয়ে তদবিরবাণিজ্য, মামলার কাগজপত্রে কাঁটাছেঁড়া করে জালিয়াতিসহ নানা কৌশলে পেশকার নুর মোহাম্মদ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন। চট্টগ্রামের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের অতীতে কর্মরত বেশ কয়েকজন বিচারকের সাথে যোগসাজশ করে এই পেশকার কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে আদালতপাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে।

সম্প্রতি সচেতন নাগরিক ফোরাম নামে পেশাজীবীদের একটি সংগঠন নুর মোহাম্মদের দুর্নীতির ১৯টি ঘটনা বর্ণনা করে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠিয়েছে। সংগঠনটি তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করে পেশকার নুর মোহাম্মদ তার ৩৩ বছর চাকরী জীবনের ২১ বছরই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আদালতে কর্মরত ছিলেন। তার কর্মজীবনে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ থাকলেও ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতেই তিনি তিন দফায় চাকরি করেছেন। এছাড়া ২য় জেলা জজ আদালতে এবং ১ম বাণিজ্যিক আদালতে দুইবার করে চাকরি করেছেন। এসব আদালতেও তার বিরুদ্ধে দুর্ণীতির অভিযোগ বিস্তর। নুর মোহাম্মদ চট্টগ্রাম আদালতের বাইরে খুব একটা চাকরি করেননি। তাকে যতবারই ‘শাস্তিস্বরূপ’ নিম্ন আদালতগুলোতে বদলি করা হয় তিনি দ্রুতই পুনঃবদলি করে চট্টগ্রাম আদালতে পোস্টিং নিয়ে নেন।

screenshot_6ওই অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয় তিনি পেশকার থাকাকালীন সময়ে ১ম যুগ্ন জেলা জজ আদালতের বিচারক বাহাউদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করে বিচারাধীন অপর মামলা নং ৪৯১/১১, অপর ২৪০/১৪, অপর ৪৮৫/১১, অপর ৩৭১/১৩, অপর ২৯৯/১৩, অপর ৯৪/১৪, অপর ২২২/১৩ মামলায় ‘কমিশনার নিয়োগ’ করা হয়। এছাড়াও সাকসেশন মিছ ২৫৭/১৪ মামলায় ১৬ সেপ্টম্বরের পরবর্তী তারিখ কাটাছেঁড়া করেন তিনি। বিভাগ মামলা ৬৬/৭৩ সংক্রান্তে উচ্চ আদালতের নথী তলবপত্র সংক্রান্তের রেজিস্ট্রারের নোট সীট ছিড়ে ফেলে দেন বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে ওই মামলায় আপীল পেন্ডিং থাকাবস্থায় ‘নজিরবিহীন’ ভাবে জারি আদেশ কার্যকর করে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট। যা সিভিল রুল এন্ড অর্ডারসের নিয়ম বহির্ভুতভাবে বলে দাবি করেন মামলার একটি পক্ষ।

জেলা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোবিন্দ প্রসাদ বলেন, ‘নুর মোহাম্মদকে বিভিন্ন অভিযোগে এই আদালত থেকে বদলি করা হলেও তিনি নানা কৌশলে আবার এখানে ফিরে আসেন। সর্বশেষ গত ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে এই আদালত থেকে ফটিকছড়ি বদলি করা হলে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেই পুনরায় এখানে বদলি হয়ে আসেন। কিছুদিন আগে প্রধান বিচারপতি চট্টগ্রামে আসলে তৎকালীন ১ম যুগ্ম জেলা জজ বাহাউদ্দিন ও পেশকার নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হলে ১ম যুগ্ম জেলা জজ বাহাউদ্দিনকে এই আদালত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু নুর মোহাম্মদ এখনো এখানে আছেন।’

টেলিফোনে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলে নিজেকে নুরুল আলম পরিচয় দিয়ে একাধিক বার প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন পেশকার নুর মোহাম্মদ।

পরে পরিচয় গোপন করে একই নম্বরে টেলিফোনে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে মামলা প্রসংগে কথা বলতে চাইলে এক পর্যায়ে তিনিই নুর মোহাম্মদ পেশকার বলে স্বীকার করেন। এরপর নিজের পরিচয় দিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে বক্তব্য জানতে চান এই প্রতিবেদক।

নিজের বিরুদ্ধে এই সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার শত্রুপক্ষ নামে-বেনামে বিভিন্ন জায়গায় আমার বিরুদ্ধে একাধিক চিঠি দিয়েছে, নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে, ভবিষ্যতেও আমার বিরুদ্ধে এধরনের অপপ্রচার চালাবে আমার শত্রুরা।’

দূর্নীতিবাজ পেশকার হিসেবে আইনজীবী সমিতির ‘রেজুলেশন’ হওয়া প্রসংগে তিনি বলেন, ‘আইনজীবী সমিতি এধরনের কতো রেজুলেশন পাশ করেছে। শুধু আমার প্রসংগে নয় আদালতের অনেক জজ, পেশকার, পিয়নকে নিয়ে রেজুলেশন পাশ করেছে। তাতে তী হয়েছে?’

আদালতের রেজিষ্ট্রারের নোট শীট ছিড়ে ফেলা, আদেশ ওভার রাইটিং, বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতি, দুর্নীতির সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন পেশকার নুর মোহাম্মদ। এক পর্যায়ে নগরীর অনেক প্রভাবশালীদের মামলা পরিচালনা করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ থাকলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আদালতের কর্মচারীদের সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা পেতাম না।’

*** ডিসি অফিসের প্রধান সহকারী ইউনুছের ‘ধনকুবের’ কাহিনী
*** পিয়নের পরিচয় ‘কোটিপতি রুবেল’!
*** সেই কোটিপতি পিয়ন রুবেলকে বদলী
*** অভিশপ্ত হয়ে উঠেছে ষোলশহর ভূমি অফিস!
*** চট্টগ্রাম কারা মেডিকেল অপরাধীদের বিলাসী ঠিকানা
*** ১৫ হাজার বেতনে ২৫ লাখ টাকার গাড়ি !
*** ‘ভুয়া’ দলিল তৈরীর হোতা পিয়ন লিয়াকত!
*** বন্দরের নিরাপত্তাকর্মীর হাতে আলাদিনের চেরাগ!