বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে চবি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০১৯, ৯:০৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অ্যাক্ট লঙ্ঘন করে চবিতে সহকারী প্রক্টর নিয়োগের হিড়িক!’ শীর্ষক সংবাদ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের কাছে ব্যাখ্যা পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (তথ্য) স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়।

একই সাথে রুটিন দায়িত্বে থাকা চবি উপ উপচার্য ড. শিরীণ আখতারের ফেসবুক পেইজেও একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত এই সংবাদের ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি পোস্ট দেওয়া হয়।

বলা হয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারকে গত ১৩ জুন ২০১৯ বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রাণালয় (স্মারক নং-শিম/:১৮/৯চ:বি:-১/২০০৬/১৭৫) মাননীয় উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব প্রদান করেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব সম্পর্কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২২/১২/২০১০ তারিখের শা:১৮/৯ চ:বি:-১/২০০৬/৫৬০ স্মারকে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। সে ব্যাখ্যা অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে ‌’চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট, ফাইন্যান্স কমিটি, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের নির্বাচনী কমিটির সভা আহ্বান এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মূল সনদপত্রে স্বাক্ষর প্রদান মাননীয় উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বের আওতায় পড়ে।’

উক্ত ব্যাখ্যা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, সহকারী প্রক্টর নিয়োগ রুটিন দায়িত্বের আওতার মধ্যে পড়ে। অতএব প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী প্রক্টর নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট লঙ্ঘন করার মত কোনো ঘটনা ঘটেনি।

প্রতিবেদকের বক্তব্য : বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ ধারা অনুযায়ী সিন্ডিকেটে রিপোর্ট করার এখতেয়ার উপ উপাচার্যকে দেয়া হয়নি। শুধু একজন পূর্ণাঙ্গ উপাচার্যকেই কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সিন্ডিকেটে রিপোর্ট করার এখতেয়ার দিয়েছে ওই অ্যাক্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা জানিয়েছেন, উপ উপাচার্যের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে সিন্ডিকেটে আলোচনারও সুযোগ নেই সিন্ডিকেট সদস্যদের।

২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর দায়িত্বপালনরত অবস্থায় অসুস্থতাজনিত কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তৎকালীন চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ আলম। এরপরই নিয়ম অনুযায়ী উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

কিন্তু রুটিন দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কোনো প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেমন সিন্ডিকেট, ফাইন্যান্স কমিটি, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের নির্বাচনী কমিটির সভা আহ্বানসহ নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর অর্থাৎ রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার ১০ দিনের মাথায় তাকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় চ্যান্সেলর। রাষ্ট্রপতি ১৯৭৩ এর (১২)২ ধারা অনুযায়ী অধ্যাপক আলাউদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব দেন। এবং ২০১০ সালের ২২ ডিসেম্বর অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হওয়ার ১৪ দিন পর শা:১৮/৯ চ:বি:-১/২০০৬/৫৬০ স্মারকে একটি চিঠি দিয়ে তাঁকে সিনেট, সিন্ডিকেট, ফাইন্যান্স কমিটি,পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের নির্বাচনী কমিটির সভা আহ্বান এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মূল সনদপত্রে স্বাক্ষর প্রদান করার নির্দেশনা প্রদান সম্বলিত একটি চিঠি দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের ব্যাখ্যায় ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আলাউদ্দিনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ব্যাখ্যাকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। অধ্যাপক আলাউদ্দিনের জন্য জারি করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি ও ব্যাখ্যা কী করে শিরিণ আখতারের জন্য প্রযোজ্য ধরে নেয়া তা বোধগম্য নয়।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, এটি একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্রাইম হিসেবেই গণ্য হবে। কারণ একজন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি। তাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর (১২)২ ধারা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ধারায় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগ সংক্রান্ত বিধান উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, Vice-Chancellor 12. (1) The Vice-Chancellor shall be appointed by the Chancellor from a panel of three persons to be nominated by the Senate for a period of four years on such terms and conditions as the Chancellor may determine. A person appointed as Vice-Chancellor shall be eligible for nomination and appointment for a second term only.

12. (2) Where any temporary vacancy in the office of the Vice-Chancellor occurs by reason of leave, illness, resignation or any other cause, the Chancellor shall make such arrangements for carrying on duties of the office of the Vice-Chancellor as he may think fit.

অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক আলাউদ্দিনের নিয়োগটি ১৯৭৩ এর অ্যাক্ট অনুযায়ী হয়েছে। এ দুটি ধারার কোনোটিই উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ নেই। যা অধ্যাপক আলাউদ্দিনের জন্য পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ ছিল।

চবির জেষ্ঠ্য শিক্ষকদের অভিমত, গত ১৩ জুন পাঠানো চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে কোনো নিয়োগ প্রদান করেননি। ফলে তিনি কিছুতেই ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের জন্য প্রেরিত চিঠির রেফারেন্স দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। তাকে মন্ত্রণালয়ে উপ সচিব রুটিন দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেছেন। যদিও অধ্যাপক শিরীণ উপাচার্য পদে ১৪ জুন পর্যন্ত অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদ থাকাকালে ১৩ জুন বিকেলে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেছেন মর্মে প্রচার ও স্বাক্ষর করেছেন। উপাচার্যের ব্যবহৃত গাড়িও নিজের জন্য নিয়ে নিয়েছেন। যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।

এ বিষয়ে একুশে পত্রিকায় ‘নিয়োগ না পেয়েও উপাচার্যের স্বাক্ষর করছেন প্রফেসর শিরীণ!’ https://www.ekusheypatrika.com/archives/65557 শিরোনামে একটি সংবাদ ১৪ জুন প্রকাশিত হয়। এ সংবাদের বিষয়ে অধ্যাপক শিরীণ কোনো ব্যাখ্যা বা প্রতিবাদ পাঠাননি।

ওই সংবাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হাবিবুর রহমান যিনি রুটিন দায়িত্বের চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন তিনি একুশে পত্রিকাকে এসব বিষয় নিশ্চিতও করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘রুটিন দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় উপ-উপাচার্য কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। বড় কোনো প্রজেক্টের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না তিনি। অভ্যন্তরীণ বদলি, নিয়োগ ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে তাঁর কোনো এখতিয়ার নেই। শুধুমাত্র অন্য কোনো জরুরি বিষয় থাকলে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণত স্বল্প সময়ের জন্য রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরমধ্যে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের মেয়াদ ১৪ জুন অপরাহ্ন পর্যন্ত রয়েছে। এরপর থেকে উপ-উপাচার্য প্রফেসর শিরীণ আখতারকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত রুটিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপাচার্য পদে বা ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য পদে তাঁকে নিয়োগ দেয়া হয়নি।’

কিন্তু এরপরও অধ্যাপক শিরীণ জরুরি কোনো প্রয়োজন না হওয়া সত্ত্বেও চবিতে নতুন চারজন সহকারী প্রক্টর নিয়োগ দিয়েছেন। যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। একুশে পত্রিকা শিক্ষক মহলের বক্তব্য ও অভিমত, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এ উল্লিখিত ধারার ভিত্তিতেই ‘অ্যাক্ট লঙ্ঘন করে চবিতে সহকারী প্রক্টর নিয়োগের হিড়িক!’ শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশ করেছে।