একুশে প্রতিবেদক : ডজনখানেক মামলার পলাতক আসামি গোলাম সরওয়ার মিলন। চট্টগ্রাম নগরজুড়ে সংগঠিত উল্লেখযোগ্য অপরাধ কর্মকান্ডে তার অনুসারীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাচ্ছে পুলিশ। তবে এই সন্ত্রাসীর কৌশলের কাছে পুলিশ প্রতিনিয়ত পরাস্ত হচ্ছে। সন্ত্রাসী মিলনকে গ্রেফতারের চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছেন সিএমপির চৌকস পুলিশ কর্মকর্তারা পর্যন্ত। দীর্ঘদিনেও মিলন গ্রেফতার না হওয়ায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেশাদার অপরাধীদের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে গোলাম সরওয়ার মিলন। চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ, পাহাড়তলী, হালিশহর, খুলশী, বন্দর, পতেঙ্গা ও সদরঘাট এলাকায় বেশী সক্রিয় তার অনুগত সন্ত্রাসীরা। এসব এলাকায় ছিনতাইসহ পেশাদার অপরাধীদের বেশীরভাগ কর্মকান্ডই পরিচালিত হয় মিলনের ইশারায়। বেশভূষা ও চলাফেরায় দারুণ স্মার্ট এই সন্ত্রাসী সবসময় পালসার ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল নিয়ে চলাফেরা করেন। খুলশী এলাকায় বসবাসকারী সন্ত্রাসী মিলনের স্ত্রী ইউএসটিসিতে চাকরি করেন।
মিলনের উত্থান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওমরগণি এমইএস কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে ডিগ্রি পাশ করা মিলন সেসময় ছাত্রলীগ নেতাও ছিলেন। পরে কোন্দলের কারণে ছাত্রলীগ ছেড়ে ১৯৯৯ সালে সন্ত্রাসী পেশা বেছে নেন মিলন। যোগ দেন শীর্ষ সন্ত্রাসী কানা বক্করের গ্রুপে। এক পর্যায়ে নানা বিষয় নিয়ে বক্করের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হলে সন্ত্রাসীদের নিয়ে আলাদা দল গঠন করে মিলন। ২০০২ সালের দিকে ১২ জনের ওই দল গঠন করে মিলন। এরপর থেকে নগরীর বেশিরভাগ অংশের অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে তার অনুগতরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে পাঁচলাইশ থানার একটি অস্ত্র মামলায় মিলন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। ওই মামলায় খালাস পেয়ে ২০০৪ সালে জেল থেকে বেরিয়ে আসে। ২০০৮ সালে ছিনতাইকালে পুলিশের গুলিতে আহত অবস্থায় ধরা পড়ে। ২০১০ সালে জামিনে বেরিয়ে আসার পর থেকে অপরাধ কর্মকান্ডে সরাসরি অংশ নিতে পারে না মিলন। পায়ে রড লাগানোর কারণে তার হাঁটতে কষ্ট হয়। তবে তার নির্দেশে অনুসারীরা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে ছিনতাই ও নানা অপরাধ করে।
সর্বশেষ ২০১২ সালের ১ এপ্রিল হালিশহর থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় গোলাম সরওয়ার মিলন। এর কিছুদিন পর জেল থেকে বেরিয়ে ফের অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী।
২০১৪ সালের ৩০ জুন সদরঘাট থানার মোগলটুলি বাজার থেকে সন্ত্রাসী কানা মান্নানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নগরীর কমার্স কলেজ কেন্দ্রিক এ সন্ত্রাসীর শরীর থেকে হাতের কব্জি কেটে বিচ্ছিন্ন করে নৃশংস কায়দায় তাকে খুন করা হয়। এ ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কানা মান্নানকে খুন করে গোলাম সরওয়ার মিলন।
নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নগরীতে ছিনতাই, টাকা লুটসহ বেশিরভাগ অপরাধে মিলনের অনুসারীরা জড়িত। খুলশী থানার ওয়ারলেস ও আমবাগান এলাকার কোন এক জায়গায় বসবাস করেন মিলন। এসব এলাকার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় সে আছে বলে জেনেছি। তবে তাকে গ্রেফতারের জন্য সিএমপির বেশ কয়েকজন চৌকস কর্মকর্তা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তার কৌশলী চলাফেরার কারণে সফলতা আসছে না।
সদরঘাট থানার ওসি মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘বর্তমান সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাম সরওয়ার মিলন খুবই দুর্ধর্ষ। গ্রেফতার এড়াতে সে বেশ কৌশলী। শত চেষ্টা করেও তাকে ধরা যাচ্ছে না। সদরঘাটের কানা মান্নান হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত অন্যতম আসামি মিলন। তার বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা আছে। এছাড়া সীতাকুন্ড থানার একটি ডাকাতি মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মিলন।’
ওসি মর্জিনা বলেন, ‘মিলনের গ্রামের বাড়ি বরিশালে বলে জেনেছি। কিন্তু তার স্থায়ী-অস্থায়ী কোন ঠিকানা আমরা জানি না। সে কখন, কোথায় থাকে তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পুলিশের জানা নেই।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘সন্ত্রাসীদেরকে গ্রেফতারের জন্য সবসময় পুলিশের চেষ্টা থাকে। কিন্তু তারা অনেক কৌশল অবলম্বন করায় পুলিশের চেষ্টা সবসময় সফল হয় না। সবার প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কোন তথ্য থাকলে সরাসরি আমাকে বা সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে দিন। জনসাধারণ সহযোগিতা করলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে থাকতে পারবে না।’