মামুনুল হক চৌধুরী : র্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে চট্টগ্রামের কারাগারে আছেন অনেক মাদক ব্যবসায়ী। কারাবন্দি এসব মাদক ব্যবসায়ী কারাগারের ভেতরেও মাদকব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বন্দিজীবনের অবসর কাটানোর জন্য অনেকেই হাত বাড়াচ্ছেন মাদকের দিকে। ফলে কারাঅভ্যন্তরে মাদকের আকাশচুম্বি চাহিদা।
অভিযোগ রয়েছে, কারাঅভ্যন্তরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটে কারাবন্দি ও তাদের স্বজন, কারা কর্মকর্তা এবং আদালতের হাজতখানার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাও যুক্ত আছেন।
এক ধরনের বিশেষ রাবার রয়েছে, যা ‘এগনেট’ নামে পরিচিত। এটি থাকে আসামীদের পায়ে, রানের নীচে কনুই বরাবর। এটি ব্যবহার করে একসাথে কয়েক হাজার ইয়াবা বেঁধে নিয়ে যেতে পারে কারাবন্দিরা। প্রতিদিন হাজিরা দিতে আদালতে আসে বিভিন্ন মামলায় বন্দি আসামিরা। যাওয়ার সময় তারা বিশেষ এই রাবার দিয়ে শরীরের সাথে বেঁধে নিয়ে যায় ইয়াবা, গাঁজা, হিরোইনের মতো মাদক।
এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকায় আছেন আসামী আদালতে আনা নেয়ার কাজে জড়িত শাহিন নামের এক ব্যক্তি। মাদকব্যবসায় সহায়দা দেয়ার পাশাপাশি আসামীদেরকে মোটা অংকের বিনিময়ে স্বজনের সাথে লকআপে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন তিনি।
যেসব আসামীরা মাদকাসক্ত কিংবা মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের স্বজনেরা সঙ্গে নিয়ে মাদক সংশ্লিষ্ট আসামীর হাতে তুলে দেয়। মহানগর ও জেলার দুটি হাজতখানার পাশেই আছে হাজতের ইনচার্জের বিশেষ কক্ষ।
পুলিশকে টাকা দিলে ওই বিশেষ রুমে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান স্বজনরা। এসময় পুলিশ তাদের একান্তে কথা বলার সুযোগ দিয়ে সরে পড়ে। এই সুযোগে তারা শরীরের ভেতর ইয়াবা ও গাঁজা বিশেষ কায়দায় সেটিং করে নেয়। এটি করতে সময় লাগে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট।
আবার জাঙ্গিয়ার ভেতর করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও আছে। এক্ষেত্রে কারা ফটকে বিনা শরীর তল্লাসিতে কিংবা তল্লাসি না করার জন্য আগে থেকে ম্যানেজ করে রাখা হয় কারা ফটকে দায়িত্বরতদের।
কারাগারে মাদকব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছেন একেক ওয়ার্ডে একেকজন। এদের মধ্যে- পুলিশের ভাই মামুন হত্যা মামলার আসামী রতন শিকদারের নিয়ন্ত্রণে কর্ণফুলী-৫, ১ লাখ ৭৫ হাজার পিস ইয়াবা মামলার আসামী জসিম ওরফে গুটি জসিমের নিয়ন্ত্রণে পদ্মা-৬, পারভেজ ও বিধান বড়ুয়ার নিয়ন্ত্রণে সাঙ্গু-১৮, আরমানের নিয়ন্ত্রণে পদ্মা-২০, শাহ আলম ওরফে ভলবো ও শাহজাহানের নিয়ন্ত্রণে সাঙ্গু-৬, মাদক মামলার আসামী রাজুর নিয়ন্ত্রণে সাঙ্গু-৪, শেখ মোহাম্মদ ওরফে বুলেটের নিয়ন্ত্রণে কর্ণফুলী-১৬, মেথর সুমনের নিয়ন্ত্রণে পদ্মা-৪, শেম্পু নাছিরের নিয়ন্ত্রণে সাঙ্গু-১৭, দিদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মেডিক্যাল ওয়ার্ড।
প্রতিদিন আদালতে আসা বিভিন্ন মামলার বন্দিদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের দাবী প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাদক ঢুকছে কারাগারে। কারা অভ্যন্তরে দায়িত্বরত মিয়া সাহেব, জমাদার, সিআইডি নামের পরিচিত কারা কর্মকর্তাদের সামনেই চলছে মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন।
কারাগারের মাদক ব্যবসা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন- এমন একজন বন্দি জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কোনো সময় কারা অভ্যন্তরে অভিযান চালালে কয়েক কোটি টাকার ইয়াবা, গাঁজা, হিরোইন ও কোকেন উদ্ধার করতে পারবে। কারা অভ্যন্তরে মাদক ব্যবসা করে মাসে লাখ লাখ টাকা স্বজনদের কাছে পাঠাচ্ছেন এমন মাদকব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক। মাদকব্যবসার টাকায় জায়গা ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণও করেছেন এমন বন্দিও আছেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির বলেন, ‘যে যত কায়দা বা পন্থা অবলম্বন করুক না কেন, আমি আমার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে বন্দি আছে, বিষয়টি বুঝতে হবে। যাদের এ পর্যন্ত ধরতে পেরেছি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি, ভবিষ্যতেও নেব। এমন কি আমার কোনো স্টাফও যদি জড়িত থাকে, তাদেরকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না।’
তিনি বলেন, ‘কারাঅভ্যন্তরে মাদক ঢুকানোর জন্য একটি চক্র বাইরে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। আর একটি চক্র তাদেরকে সহযোগিতা করছে। আপনারা সবার কথা সমানভাবে লিখেন। কারাবন্দিদের ভাল রাখার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কাজ করছি। কিন্তু কিছু কিছু সহকর্মীদের জন্য সমালোচিত হচ্ছি।’- বলেন জেল সুপার।