মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

আদালতের নির্দেশ অমান্য করে ইংরেজি সাইনবোর্ডের ছড়াছড়ি, নির্বিকার চসিক

| প্রকাশিতঃ ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১১:৫৮ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : আইনে নিষিদ্ধ হলেও নগরজুড়ে বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, গাড়ির নম্বর প্লেট, ব্যানার, বিভিন্ন দফতরের নামফলক ব্যবহার করা হচ্ছে অহরহ। ছোট থেকে বড় প্রায় সকল দোকান, অফিস কিংবা প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় বড় অক্ষরে ব্যবহার করা হচ্ছে ইংরেজি অক্ষর।

অভিজাত শপিংমল, বিপণীবিতান, বিশ্ববিদ্যালয়, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড, এমনকি মূল ফটকে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে ইংরেজি ভাষা। রঙিন ও বড় অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে প্রতিষ্ঠানের নাম। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে ইংরেজির পাশে বাংলা ভাষার প্রয়োগ থাকলেও তা লেখা থাকে খুবই ছোট আকারে।

যদিও ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ৩০ দিনের মধ্যে সাইনবোর্ড বাংলায় প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সেসময় দৃশ্যমান এসব সাইনবোর্ড-বিলবোর্ডে বাংলা লেখা নিশ্চিত করতে ৫ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

ইংরেজিতে লেখা সব ধরনের সাইনবোর্ড ও ব্যানার উচ্ছেদে চসিকের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৪৭ মাস পার হয়ে গেলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই বিজ্ঞপ্তির নির্দেশনা গায়ে মাখেননি কেউই। চসিক থেকেও পরিচালনা করা হয়নি কোনো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান।

ব্যবসা সনদ (ট্রেড লাইসেন্স) নেওয়ার সময় সাইনবোর্ডে বাংলা ব্যবহারের বিষয়ে সিটি করপোরেশন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে থাকে। ‘সাইনবোর্ড/ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে’- অতিরিক্ত একটি সিলের মাধ্যমে কথাটি উল্লেখ করা থাকে ব্যবসা সনদে। কিন্তু এই নির্দেশনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নগর জুড়ে চলছে আইনলঙ্ঘন।

ইংরেজিতে সাইনবোর্ড লেখা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা হলে সকলেই ইংরেজিতেই সাইনবোর্ড ব্যবহারের কারণ হিসেবে ব্র্যান্ডের লোগো ও নাম ইংরেজিতে থাকার অজুহাত দেখিয়েছেন। অনেকে জানেন না এই সংক্রান্ত আদালতের আদেশ ও চসিকের প্রজ্ঞাপনের বিষয়টিও।

চসিক সচিব আবু শাহেদ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নগরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত সাইনবোর্ডে ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা পরিবর্তন করার জন্য আমরা বিজ্ঞপ্তি দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম। এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিচ্ছি এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরাও খেয়াল করেছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামফলকে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার নিয়ে আদালতের আদেশটি এখনও বলবৎ রয়েছে। আদালতের আদেশ মানেই আইন। যারা এই আইন অমান্য করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা চসিক-এর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আর এটি চলমান একটি প্রক্রিয়া।’

চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন রদবদল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আমাদের একটু ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। তবে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিয়ে সরকারের যে আইন আছে তা ঠিকমতো মানা হচ্ছে কিনা সেই বিষয়ে আমরা কঠোর ভূমিকা পালন করবো। আশা করছি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে নতুন বছরেই এর ফলাফল আপনারা দেখতে পারবেন।’

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিদেশি দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠান বাদে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, দফতরগুলোর নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে নির্দেশ দেন আদালত। একই বছরের ১৪ মে সকল সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডকে সাইনবোর্ড ও নামফলক বাংলায় লেখা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ২৯ মে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মাধ্যমে এটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়। তারপরেও সাইনবোর্ড, বিলবোর্ডে বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত বিষয়টির কড়া সমালোচনা করেন।