সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আলু এখন গলার কাঁটা, কৃষক বাঁচবে কীভাবে?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১৮ মার্চ ২০২৫ | ২:৫৫ অপরাহ্ন


আলু তোলার মৌসুম শুরু হয়েছে ধুমধাম করে। মাঠ জুড়ে এখন আলু আর আলু। বাম্পার ফলন হয়েছে, কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আলুর দাম নেই, পানির দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকের চোখেমুখে এখন শুধুই হতাশার ছাপ।

গত এক দশকে আলুর দাম এত কম কখনো দেখা যায়নি। জমিতেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে কেজি প্রতি মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকায়। এই দামে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, শ্রমিকের মজুরিও উঠছে না। কৃষকরা বলছেন, এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা।

বিপুল পরিমাণ আলু নিয়ে এখন কী করবেন, সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না আলুচাষিরা। একদিকে বাজারে ক্রেতা নেই, অন্যদিকে হিমাগারে রাখারও জায়গা নেই। হিমাগার মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রায় দ্বিগুণ। গত বছর যেখানে প্রতি কেজি আলুর ভাড়া ছিল ৪ টাকা, সেখানে এবছর গুণতে হচ্ছে ৮ টাকা।

এই অবস্থায় আলু চাষিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। না পারছেন আলু বিক্রি করতে, না পারছেন সংরক্ষণ করতে। অনেকেই ব্যাংক এবং মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন। এখন সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, সেই চিন্তায় তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

আলুর ফলন ভালো হওয়াটা কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা। কিন্তু বাজারের এই অবস্থায় সেটা যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম কমে গেছে, একথা সত্যি। কিন্তু এর পেছনে যে আরও বড় কারণ রয়েছে, সেটা হলো সিন্ডিকেট।

এই সিন্ডিকেট নতুন কিছু নয়। এ যেন আমাদের বাজার ব্যবস্থার এক পুরোনো রোগ। হিমাগার মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে, আর তার বলি হয় সাধারণ কৃষক।

দুঃখজনক হলো, প্রতিটি সরকারের আমলেই এই সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে। তারা এতটাই শক্তিশালী যে, এদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন।

এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কোনো কৃষক যদি তার ফসলের ন্যায্য দাম না পান, তাহলে তিনি সেই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাবেন। আলুর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। দাম না পেলে পরের মৌসুমে আলু চাষ কমবে, তাতে সন্দেহ নেই।

আমরা সবাই চাই, বাজারে একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকুক। যেখানে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য দাম পাবেন, আবার ভোক্তারাও সহনীয় মূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

এই সিন্ডিকেট ভাঙা কি সত্যিই খুব কঠিন? সরকার যদি চায়, তাহলে অবশ্যই পারে। দরকার শুধু সদিচ্ছা আর কঠোর পদক্ষেপ। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা গেলে, সিন্ডিকেটগুলো এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়বে।

শুধু আলু নয়, অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। মৌসুমে যখন ফসল ওঠে, তখন দাম কমে যায়। আর যখন মৌসুম থাকে না, তখন দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। এর কারণ সেই একই, সিন্ডিকেট।

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে- এটা শুধু কথার কথা নয়। কৃষকরাই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে, দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আমরা আশা করবো, সরকার এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝবে। শুধু আলুর বাজার নয়, সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।

ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। বাজারে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে, প্রতিবাদ করতে হবে। সবাই মিলে সোচ্চার হলে, সিন্ডিকেটগুলো টিকতে পারবে না।

আলু চাষিদের এই দুর্দশা যেন আমাদের চোখ খুলে দেয়। সময় এসেছে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। কৃষক এবং ভোক্তা উভয়ের স্বার্থে, বাজারের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এখন জরুরি।

সরকারের পাশাপাশি, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে, বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত রাখার। সৎ ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে হবে, অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আলু নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নয়তো, এই সংকট আরও বাড়বে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তার প্রভাব পড়বে পুরো দেশের ওপর।

আমরা চাই, কৃষক হাসিমুখে ফসল ফলাবে, আর সেই ফসল ন্যায্য দামে বিক্রি করে লাভবান হবে। তবেই তো দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, সমৃদ্ধি আসবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।