
ধরুন, আপনি একেবারে ব্র্যান্ড নিউ একটি জামা কিনলেন সেরা কোনো আউটলেট থেকে। এরপর জামাটি পরিধান না করে প্রায় চার-পাঁচ বছর যত্ন করে ওয়ারড্রোবে রেখে দিলেন। যখন আপনি সেটি বের করে পরিধান করবেন, দেখবেন শুরুতে পরিধান না করা সত্ত্বেও সেটির মান ও আয়ু কমে গেছে এবং এমনও হতে পারে যে সেটি একেবারেই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে অথবা পরিধান করতে গেলে সহজেই ছিঁড়ে যাচ্ছে। কাপড়ের বাহ্যিক অবয়ব ঠিক থাকলেও এর ভেতরের রাসায়নিক গঠন বা বন্ধন (Chemical Structure or Bonding) ভেঙে যাওয়ার কারণে এই পলিমারিক পদার্থটি খুব ভঙ্গুর হয়ে গেছে।
ঠিক তেমনিভাবে, যখন আমরা কোনো সতেজ চিন্তাভাবনা করি, ইতিবাচক ধারণা নিয়ে সামনে আসি, তখন সুন্দরের বিকাশ ঘটতে থাকে। আর যখন আমরা এ ধরনের সতেজ চিন্তা বা ইতিবাচক ভাবনাগুলোর চর্চা না করি, বিকশিত না করি, বরং পাশ কাটিয়ে কুৎসিত চিন্তাভাবনা করি এবং গড়পড়তাভাবে সময় পার করি, কয়েক বছর পর দেখা যাবে আমাদের সুস্থ চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে বা সুস্থ চিন্তার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। অন্তরের মধ্যে ভালো কথা বসছে না, অন্তর থেকে ভালো কথা বের হচ্ছে না – অর্থাৎ অন্তর যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। আত্মার খোরাক হিসেবে উন্নত চিন্তা ও ভালো মানসিকতা পোষণ করা খুবই জরুরি। আত্মা কলুষিত হয় বেশ কিছু কারণে। তাই অন্তরকে কপটতা থেকে, জিহ্বাকে মিথ্যাচার থেকে, চোখকে কুদৃষ্টি থেকে, কথাকে অর্থহীন বাক্যব্যয় থেকে, লেনদেনকে প্রতারণা থেকে এবং জীবনকে দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত করা প্রয়োজন। আর এই পুরো বিষয়টিকে এককথায় বলা হয় আত্মশুদ্ধি।
শুরুতে উল্লিখিত কাপড়টির অভ্যন্তরীণ গঠন ভেঙে যাওয়ার কারণে যেমন সেটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তেমনিভাবে মানুষের মনোজগৎ, অন্তর বা বিবেক তথা আত্মা কলুষিত হওয়ার কারণে, বাহ্যিক অবয়ব ঠিক থাকলেও মানুষ ভেতর থেকে ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে।
পঞ্চইন্দ্রিয়—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক—এবং দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঠিক ও সংযত ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে, এবং দেহ–মনকে অন্যায়, নিষিদ্ধ কাজ ও মন্দ বিষয় থেকে বিরত রাখার দ্বারা আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ করা সম্ভব। ষড়রিপু—কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ (অহংকার), মোহ, মাৎসর্য—ইত্যাদির তাড়না মানুষের জ্ঞান বা বিবেককে বাধাগ্রস্ত করে, তাই এ প্রবৃত্তিগুলো শত্রু নামে অভিহিত। এসবের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে সুসভ্য ও উন্নততর করে। এগুলোর যথেচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে পশুর চেয়েও অধম করে দেয়, অধঃপতনের অতল তলে নিমজ্জিত করে।
লোহায় মরিচা ধরলে যেমন তা ক্ষয় হতে থাকে, তেমনি আত্মা কলুষিত হলে বা মস্তিষ্ক অলস থাকলে অথবা নেতিবাচক চিন্তায় মগ্ন থাকলে তা ‘শয়তানের কারখানা’ হিসেবে কাজ করে। ডক্টর ফস্টাস যখন অশুভ শক্তির প্রলোভনে পড়েছিলেন, তখন তিনি তার জ্ঞানকে লুসিফারের প্রতিনিধি মেফিস্টোফিলিসের কাছে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলেও, শয়তানের অনুসারীরা এসে ডক্টর ফস্টাসের আত্মাকে তার শরীর থেকে বের করে নরকে নিয়ে যায়। একটি শিক্ষিত আত্মা কলুষিত হয়ে কীভাবে করুণ পরিণতি বরণ করেছিল, তা এক চরম শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে আছে।
অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা, আত্মিক উন্নতি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন করতে না পারলে অতিরিক্ত কামনা-বাসনা, লালসা, অন্যায় আকাঙ্ক্ষা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, আত্মপ্রচার, অহংকার, কার্পণ্য ইত্যাদি মনকে গ্রাস করে ফেলে। এসব থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব না হলে হয়তো লোকদেখানো জীবন কাটানো যায়, কিন্তু আত্মার উপযোগিতা বা সজীবতা নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মনের গভীরে অনেক সময় কুৎসিত চিন্তা বাসা বাঁধে এবং নোংরা প্রবৃত্তিগুলো বেরিয়ে আসতে চায়। তবে অন্তরে কিলবিল করতে থাকা এসব কুৎসিত দিককে অবদমন করাই মনুষ্যত্ব। নেতিবাচকতা পরিহার করে ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাস গড়া, বিক্ষিপ্ত মানসিকতাকে কেন্দ্রীভূত করা, সুন্দর ভাবনার প্রবাহ সচল রাখা, কুচিন্তা বা দুশ্চিন্তাকে আশাবাদী চিন্তায় রূপান্তর করা এবং অযৌক্তিক ভাবনাকে যুক্তি দিয়ে দমন করার মাধ্যমে আত্মিক পতন রোধ করা সম্ভব।
জন মিলটনের ‘Comus’ কবিতায় এই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়:
“রাতে একটি কৃষ্ণবর্ণ মেঘ তার রূপালী আস্তরণটি ফুটিয়ে তোলে,
এবং এই গুচ্ছাকৃতির খাঁজের উপর একটি ঝলক ফেলে”
(Turn forth her silver lining on the night, And casts a gleam over this tufted grove.”)
ইংরেজি প্রবাদ “Every Cloud Has a Silver Lining”-এর মূলভাব এখানেই নিহিত। এই প্রবাদটি ইঙ্গিত দেয় যে, সবচেয়ে কঠিন সময়েও সবসময় ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়ার বা শেখার অবকাশ থাকে। সবচেয়ে নেতিবাচক বা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যেও ইতিবাচক দিক খুঁজে বের করতে হবে। তা না করতে পারলে মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং ভঙ্গুর ও দুর্বল মন নিয়ে প্রতিকূল সময়ের মুখোমুখি হতে হয়। তখন যতই নতুন পোশাক পরিধান করি না কেন, বাহ্যিকভাবে হয়তো নিজেদের চাকচিক্য ধরে রাখা যায়, কিন্তু আত্মার কলুষতা ঢাকার কোনো সুযোগ নেই।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন একজন মানুষ প্রায় ৬,০০০-এর বেশি চিন্তা করে, যার বেশিরভাগই উদ্বেগজনক ও নেতিবাচক হতে পারে। আমাদের মন অনেক কিছু ভাবতে পারে, কিন্তু সেটাই বাস্তবতা নয়। সব চিন্তার পেছনে ছোটার প্রয়োজন নেই, আবার ভাবনার দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ রাখাও সম্ভব নয়। তাই আশাজাগানিয়া, উন্নত চিন্তাকে বিকশিত করার সুযোগ দিলে আত্মার পরিপুষ্টি সাধিত হবে এবং নতুন আত্মিক উপযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
লেখক : সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, নরসিংদী।