
আবারও শোকের মাতম বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। আবারও অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে অকালে ঝরে গেল এক নিষ্পাপ প্রাণ। মাত্র ছয় মাসের শিশু ইয়াছিন আরাফাত মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে হারিয়ে গিয়েছিল খোলা নর্দমার অন্ধকারে। ১৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তার নিথর দেহ যখন চাক্তাই খাল থেকে উদ্ধার করা হলো, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো চট্টগ্রাম যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল এক তীব্র বেদনা আর ক্ষোভে।
গত শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তথাকথিত উন্নয়নের ডামাডোলের নিচে আমরা কতটা অরক্ষিত, কতটা নিরাপত্তাহীন। শিশুটির মা তার সন্তানকে নিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় যাচ্ছিলেন নগরের কাপাসগোলা এলাকা দিয়ে। নবাব হোটেলের সামনে রিকশাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় পাশের নালায়। আর সেই মুহূর্তেই মায়ের কোল থেকে ছিটকে পানির স্রোতে ভেসে যায় আরাফাত। মায়ের আহাজারি আর স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় নালার তীব্র স্রোত আর অন্ধকার। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা অনেক খুঁজেও রাতে তার সন্ধান পাননি। পরদিন সকালে শিশুটির মৃতদেহ খুঁজে পান স্থানীয়রা, সেই পরিচিত দৃশ্য – একটি সম্ভাবনার মৃত্যু, একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই মৃত্যুর দায় কার? কার অবহেলায় এই ছয় মাসের শিশুকে মায়ের কোল হারাতে হলো? কার গাফিলতিতে একটি পরিবারে নেমে এলো এমন ঘোর অমানিশা? চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন? চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)? নাকি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী?
এলাকাবাসী পরিষ্কার অভিযোগ করছেন, কাপাসগোলায় যেখানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের জন্য খালের পাশের নিরাপত্তাবেষ্টনী খুলে রাখা হয়েছিল। সেই বেষ্টনীটুকু যথাস্থানে থাকলে হয়তো রিকশাটি নালায় পড়া থেকে রক্ষা পেত, বেঁচে যেত আরাফাতের প্রাণ। এটি যদি সত্যি হয়, তবে এর চেয়ে বড় ফৌজদারি অপরাধ আর কী হতে পারে? একটি উন্নয়ন প্রকল্প যখন মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই উন্নয়ন কার স্বার্থে?
চট্টগ্রামে খোলা ড্রেন বা নালায় পড়ে মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। নগরবাসীর স্মৃতিতে এখনও দগদগে হয়ে আছে কয়েক বছর আগে আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে পা পিছলে ড্রেনে পড়ে মারা যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহেরিন মাহবুব সাদিয়ার ঘটনা। মুরাদপুরে পানির নিচে ডুবে থাকা রাস্তায় হাঁটার সময় ড্রেনে পড়ে নিখোঁজ হওয়া সবজি বিক্রেতার কথাও আমরা ভুলিনি। প্রতিটি ঘটনার পরই কিছু আলোচনা হয়, তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। কোনও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, কারও কোনও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয় না। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে, আর আমরা শুধু আফসোস করে যাই।
আমরা যারা চট্টগ্রামে বড় হয়েছি, তারা জানি বর্ষাকাল এই শহরের মানুষের জন্য কতটা অভিশাপ বয়ে আনে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। খোলা নালা, নর্দমা আর রাস্তার পার্থক্য তখন মুছে যায়। ম্যানহোলের ঢাকনা সরে গিয়ে কিংবা নির্মাণ কাজের জন্য খুঁড়ে রাখা গর্ত – সবই তখন একেকটি মরণফাঁদ। অথচ এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর ও টেকসই কোনও উদ্যোগ আমরা দেখি না। প্রতি বছর বর্ষার আগে কিছু তোড়জোড় শুরু হয় বটে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। খাল খনন আর নালা পরিষ্কারের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়, কিন্তু নগরবাসীর দুর্ভোগ কমে না।
উন্নয়নের গল্প শোনানো হয় প্রতিনিয়ত। ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দেখিয়ে বলা হয় চট্টগ্রাম বদলে যাচ্ছে। কিন্তু যে শহরের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে মানুষ ড্রেনে পড়ে মারা যায়, যে শহরে সামান্য বৃষ্টিতে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সে শহরের উন্নয়নকে কি আদৌ জনবান্ধব বলা চলে? সাগর আর পাহাড়ের অপরূপ মেলবন্ধনে গড়া এই চট্টগ্রামকে অপরিকল্পনা, অবহেলা আর অযত্নে আমরা তিলে তিলে ধ্বংস করে ফেলেছি। পাহাড় কেটে, খাল ভরাট করে, নালা দখল করে আমরা ডেকে এনেছি জলাবদ্ধতার মতো ভয়াবহ দুর্যোগ, সৃষ্টি করেছি মৃত্যুর ফাঁদ।
এই চরম অব্যবস্থাপনা আর দায়িত্বহীনতার শেষ কোথায়? ২০২৫ সালে এসেও কেন একটি শিশুকে ড্রেনে পড়ে মরতে হবে? কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে নালায় তলিয়ে যেতে হবে? এই ব্যর্থতার দায়ভার কি কেবল সিটি করপোরেশন বা সিডিএ’র? যারা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন বা আছেন, সেইসব নীতি নির্ধারকদেরও কি কোনও দায় নেই? তাদের কি একবারও মনে হয় না, এই শহর এবং এর নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের পবিত্র দায়িত্ব?
এখন দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায়। জাতির অনেক প্রত্যাশা এই সরকারের কাছে। আমরা জানতে চাই, চট্টগ্রামের এই ধারাবাহিক মৃত্যুর মিছিল বন্ধে তারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? কাপাসগোলার এই মর্মান্তিক ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কি? নাকি অতীতের মতোই এটিও আরেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই চাপা পড়ে যাবে?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রামেরই সন্তান। এই শহরের আলো-বাতাসে তিনি বড় হয়েছেন। আমরা তাঁর কাছে আকুল আবেদন জানাই, আপনি আপনার প্রিয় চট্টগ্রামকে বাঁচান। এই শহরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে আপনি কার্যকর উদ্যোগ নিন। নিশ্চিত করুন, আর কোনও মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়। আর কোনও সম্ভাবনাময় প্রাণ যেন খোলা নালার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়। চট্টগ্রামে এখন কান্না নয়, সমাধান দরকার। এই মৃত্যুর দায় নির্দিষ্ট করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে কঠোর শাস্তি ও স্থায়ী প্রতিকার। নইলে এই লজ্জা আমাদের সবার।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।