সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ড. ইউনূসের ‘তিন শূন্য’ দর্শন কি পারবে অর্থনীতির সংকট কাটাতে?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২৭ এপ্রিল ২০২৫ | ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন


বিগত সরকার পতনের পর দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে এক গভীর অনিশ্চয়তা এবং নানামুখী সংকট নেমে এসেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ বর্তমানে আরও প্রকট হয়েছে দারিদ্র্য এবং অতিদারিদ্র্য ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, সামনের পথটি অত্যন্ত বন্ধুর এবং কণ্টকাকীর্ণ। একদিকে মানুষের আয় কমেছে, কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, যা বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলেছে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে প্রধানত তিনটি বিশাল এবং জরুরি কাজ রয়েছে। প্রথমত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি হলো, লাগামহীন মূল্যস্ফীতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে ওষুধপত্র—সবকিছুর দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই মূল্যস্ফীতি গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকারকে তাই মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর রাশ টেনে ধরতে হবে।

দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জটি হলো দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। বিনিয়োগ শুধু নতুন কর্মসংস্থানই তৈরি করে না, এটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রযুক্তির সূচনা করে, কর্মীদের দক্ষতা বাড়ায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনে। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর আর্থিক খাত এবং কিছুটা অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরিয়েছে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো, দেশের বিপুল সংখ্যক গরিব, অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর আওতা আরও বিস্তৃত করা এবং মাসিক ভাতার পরিমাণ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বৃদ্ধি করা। বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্য এই কর্মসূচিগুলো বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, এই সাহায্য যেন কোনো দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রকৃত হকদারদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।

অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, আমাদের দেশে দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে থাকা জনগোষ্ঠী অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি এতটাই দুর্বল যে, মূল্যস্ফীতির সামান্য ধাক্কা বা পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের অসুস্থতাই তাদের আবার দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একই ধরনের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, বিগত সরকারের আমলে আর্থিক খাতে যে ব্যাপক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে, তার ফলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখনই যদি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে দৈনিক ২ ডলার ১৫ সেন্টের (প্রায় ২৩৫ টাকা) কম আয় করা মানুষের সংখ্যা, অর্থাৎ অতিদরিদ্রের হার, আশঙ্কাজনকভাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো যদি সরকার সফলভাবে মোকাবিলা করতে না পারে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। দেশে শুধু দারিদ্র্যই বাড়বে না, সমাজে ধনী ও গরিবের মধ্যেকার বৈষম্য আরও তীব্র হবে। এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তোষেরও কারণ হতে পারে। তবে, হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি শক্তিশালী ও সুচিন্তিত অর্থনৈতিক সংস্কার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। এর জন্য সরকারকে সাহসী এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো প্রয়োজন। এটি গরিব মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেবে, যদিও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আর ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বশর্ত হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি। তাই দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকারের চেষ্টার কোনো কমতি রাখা উচিত নয়।

পাশাপাশি, সরকারের চলমান অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, যেমন – শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি ও উপবৃত্তি, মা ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার নানা প্রকল্প, এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পগুলো শুধু চালু রাখলেই হবে না, সেগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে যেন এই সুবিধাগুলো বিতরণে কোনো পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি না হয়। বিশেষ করে এই মুহূর্তে সরকারের তিনটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন: বিনিয়োগ বাড়ানোর সবরকম উদ্যোগ নেওয়া, দেশের কৃষক সমাজ যেন তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিত করা, এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কার্যকর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

এই কঠিন সময়ে দেশের মানুষ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকেই মনে করছেন, তার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সহায়ক হবে। দারিদ্র্য বিমোচনে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা সর্বজনবিদিত। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত বই ‘এ ওয়ার্ল্ড অব থ্রি জিরোস’-এ তিনি কেবল দারিদ্র্য নয়, বেকারত্ব এবং পরিবেশ দূষণ (নিট কার্বন নিঃসরণ) মুক্ত একটি বিশ্ব গড়ার রূপরেখা দিয়েছিলেন। এই দর্শন বর্তমান বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

ড. ইউনূস বরাবরই বলে এসেছেন যে, দারিদ্র্য মানুষের সৃষ্টি, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অনিবার্য বাস্তবতা নয়। সম্পদের সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের অভাবেই সমাজে দারিদ্র্যের শেকড় গাড়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক নীতি, পরিকল্পনা এবং মানুষের অন্তর্নিহিত উদ্যোক্তা শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো সম্ভব। বিশ্বজুড়ে তার ক্ষুদ্রঋণ মডেল এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করেছে। আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা, তার সেই বিশ্বনন্দিত মডেল ও অভিজ্ঞতা তিনি নিজ দেশ বাংলাদেশেও সফলভাবে প্রয়োগ করে একটি নজির স্থাপন করবেন। এই ক্রান্তিকালে তার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে, তাকে এবং তার সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা আমাদের সকলের নাগরিক দায়িত্ব।

ইতিমধ্যে আমরা লক্ষ্য করছি যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একইসাথে, দেশে বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়াতে প্রধান উপদেষ্টা নিজে বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ঢাকায় একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করাও এই প্রচেষ্টারই অংশ। এই সম্মিলিত উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে যদি দেশে নতুন বিনিয়োগ আসে, তাহলে আশা করা যায় নতুন শিল্পকারখানা স্থাপিত হবে, ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। আর কর্মসংস্থান বাড়লে দারিদ্র্য আপনাআপনিই কমতে শুরু করবে।

সামগ্রিকভাবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতে জরুরি সংস্কারের সফল বাস্তবায়ন, দেশে ও বিদেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসার পরিবেশকে স্থিতিশীল ও সহজ করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব হ্রাস, এবং সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করার মতো সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সামনে থাকা এই কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সফল হবে—এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এবং আন্তরিক প্রত্যাশা। সরকারের সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।