
কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: নিউজরুমে এমন একজন সহকর্মী পেলে কেমন হতো—যে কখনো ঘুমায় না, কখনো কিছু ভোলে না, আর চোখের পলকে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র পড়ে ফেলতে পারে? এমন এক ক্লান্তিহীন ‘ইন্টার্ন’-এর স্বপ্ন হয়তো অনেক সাংবাদিকই দেখেন।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) ব্রাজিলের অনুসন্ধানী সাংবাদিক রেনাল্ডো শ্যাভেস জানালেন, এই স্বপ্ন এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। কোডিং না জানলেও সাংবাদিকরা এখন তৈরি করতে পারেন নিজেদের ব্যক্তিগত ‘এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সহকারী।
‘বিল্ডিং অ্যান এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস’ সেশনে ব্রাজিলের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যাসোসিয়েশন (আব্রাজি)-এর প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর রেনাল্ডো শ্যাভেস দেখান, কীভাবে সাধারণ চ্যাটবটের সীমানা ছাড়িয়ে ‘এআই এজেন্ট’ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
চ্যাটবট বনাম এআই এজেন্ট: পার্থক্য কোথায়?
আমরা সাধারণত যেসব চ্যাটবট ব্যবহার করি, সেগুলো অনেকটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যন্ত্রের মতো। একটি প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়, পরের প্রশ্নে আগের কথা ভুলে যায়। কিন্তু ‘এআই এজেন্ট’ কাজ করে একজন স্মার্ট সহকারীর মতো। এটি আপনার আগের নির্দেশনা মনে রাখে, জটিল কাজের ধাপগুলো বোঝে এবং আপনার কাজের ধরন থেকে শিক্ষা নেয়।
রেনাল্ডো বলেন, “এআই এজেন্ট হলো আপনার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সহযোগী। এটি আপনার অনুসন্ধানের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেয়, পরবর্তী ধাপগুলো কী হতে পারে তা নিজেই প্রস্তাব করে এবং নিউজরুমের সম্পাদকীয় মানদণ্ড মেনে কাজ করে।”
কেন প্রয়োজন এই কৃত্রিম সহকারী?
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্যের পাহাড় ডিঙানো এক বড় চ্যালেঞ্জ। রেনাল্ডো তিনটি প্রধান সুবিধার কথা উল্লেখ করেন:
১. গতি ও ব্যাপ্তি: আদালতের হাজার পাতার নথিপত্র বা ফাঁস হওয়া ইমেইল পড়তে যেখানে মানুষের মাসের পর মাস সময় লাগে, এআই এজেন্ট তা কয়েক মিনিটেই সারাংশ করে দিতে পারে। এতে সাংবাদিকরা পড়ার টেবিলে সময় নষ্ট না করে আসল রিপোর্টিংয়ে মন দিতে পারেন।
২. প্যাটার্ন শনাক্তকরণ: মানুষের চোখে যা এড়িয়ে যেতে পারে, এআই তা সহজেই ধরে ফেলে। বিভিন্ন নথিপত্রের মধ্যে নাম, তারিখ বা ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে বের করা এবং অসঙ্গতিগুলো ধরিয়ে দেওয়াই এর কাজ।
৩. নতুন অ্যাঙ্গেল: যখন কোনো স্টোরি নিয়ে সাংবাদিকরা আটকে যান বা ‘রিপোর্টার্স ব্লক’-এ পড়েন, তখন এআই এজেন্ট ব্রেনস্টর্মিং পার্টনার হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি ডেটা বিশ্লেষণ করে নতুন অনুসন্ধানী অ্যাঙ্গেল বা ফলো-আপ প্রশ্নের ধারণা দিতে পারে।
তবে রেনাল্ডো বারবার একটি ‘গোল্ডেন রুল’ বা স্বর্ণালী নিয়মের কথা মনে করিয়ে দেন: “কখনো বিশ্বাস করবেন না, সব সময় যাচাই করুন”।
এআই এজেন্টগুলো মাঝে মাঝে ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে। তারা বিশ্বাসযোগ্যভাবে মিথ্যা উদ্ধৃতি বা সোর্স বানিয়ে ফেলতে পারে। এ ছাড়া সংবেদনশীল তথ্য বা হুইসেলব্লোয়ারের দেওয়া নথিপত্র ফ্রি এআই টুলে আপলোড করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে সোর্সের গোপনীয়তা ফাঁস হতে পারে।
কীভাবে তৈরি করবেন নিজের এআই সহকারী?
সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই সহকারী তৈরি করতে কোনো কোডিং জানার প্রয়োজন নেই। ‘নো-কোড’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাংবাদিকরা সহজেই এটি করতে পারেন।
গুগল জেমিনি জেমস (Google Gemini Gems): এটি গুগল ওয়ার্কস্পেসের সঙ্গে যুক্ত এবং দ্রুত কাস্টম এজেন্ট তৈরির জন্য সেরা। বিশেষ করে ডকুমেন্ট সামারি বা সারাংশ তৈরির কাজে এটি পটু।
ওপেনএআই কাস্টম জিপিটি (OpenAI Custom GPTs): জটিল কাজের প্রবাহ এবং দীর্ঘ আলোচনার জন্য এটি বেশ কার্যকর। এর ‘এজেন্ট বিল্ডার’ অপশনটি ব্যবহার করে ভিজ্যুয়াল ওয়ার্কফ্লো তৈরি করা যায়।
বিকল্প টুল: ক্লদ আর্টিফ্যাক্টস (Claude Artifacts), মাইক্রোসফট কোপাইলট স্টুডিও এবং ডকুমেন্ট ক্লাউড-এর মতো টুলগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে।
সঠিক নির্দেশনা বা ‘প্রম্পট’ দেওয়ার কৌশল
এআই-এর কাছ থেকে সঠিক তথ্য পেতে হলে তাকে সঠিক নির্দেশনা বা ‘প্রম্পট’ দেওয়া জরুরি। রেনাল্ডো বলেন, প্রম্পট হতে হবে সম্পাদকীয় অ্যাসাইনমেন্টের মতো সুনির্দিষ্ট।
১. ভূমিকা ঠিক করে দিন: “তুমি একজন অনুসন্ধানী গবেষণা সহকারী, যে আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে কাজ করছ।”
২. কাজ নির্দিষ্ট করুন: “এই নথিপত্রটি পড়ো এবং স্বার্থের সংঘাত বা সময়ের অসঙ্গতিগুলো খুঁজে বের করো।”
৩. প্রেক্ষাপট দিন: “আমি পৌরসভা নির্বাচনের দুর্নীতি নিয়ে কাজ করছি, ঠিকাদার এবং কর্মকর্তাদের সম্পর্কের দিকে নজর দাও।”
৪. ফরম্যাট এবং সাইটেশন: “ফলাফলগুলো বুলেট পয়েন্ট আকারে দাও এবং প্রতিটি দাবির পাশে নথির পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করো।”
রেনাল্ডো তার সেশন শেষ করেন একটি সতর্কবার্তা দিয়ে: “এআই এজেন্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার, কিন্তু তারা সাংবাদিকদের বিকল্প নয়। আপনার সন্দেহপ্রবণতা, সম্পাদকীয় বিচারবুদ্ধি এবং যাচাই করার দায়বদ্ধতাই সাংবাদিকতার আসল ভিত্তি।”