সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ৭:৫৮ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। নিহত মোতালেব র‍্যাবে ডিএডি (ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় অভিযানের সময় এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় আরও তিনজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, র‍্যাবের একটি দল অভিযানে গেলে দুর্বৃত্তরা অতর্কিত গুলি চালায়, এতে হতাহতের এই ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি গত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা কয়েক হাজার অবৈধ বসতি নিয়ে কার্যত একটি ‘নিষিদ্ধ নগরী’তে পরিণত হয়েছে। সেখানকার দখলদারিত্ব ও প্লট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে দুর্ধর্ষ সশস্ত্র বাহিনী। এলাকাটিতে বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা রয়েছে এবং বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকারও সেখানে সীমিত।

অভিযোগ রয়েছে, এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে দুটি শক্তিশালী পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। এর একটি ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’, যার নেতৃত্বে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া। অন্যটি ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’, যা নিয়ন্ত্রণ করেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। বর্তমানে এই দুই সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। মূলত এই নেতাদের ছত্রছায়ায় সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বাণিজ্য ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের এই এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি পাহাড় ও খাসজমি দখল হয়ে আছে। জেলা প্রশাসন সূত্র অনুযায়ী, লিংক রোড সংলগ্ন এই এলাকায় দখল হয়ে থাকা সরকারি খাসজমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে। সরকারি এই জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সোমবারের ঘটনাটিও এরই ধারাবাহিকতা বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। সবশেষ ওই এলাকায় দুটি পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একজন নিহত হন। এর পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলার শিকার হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সেখানে উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়েছিল। ওই ঘটনায় তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। এছাড়া ২০২২ সালেও একাধিকবার র‍্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।