সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সময় এখনই

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ৯:২১ অপরাহ্ন

আজ ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখটি চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলার ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবকে দেখলে একসময় বাঘা বাঘা সন্ত্রাসীদের বুকে কাঁপন ধরত, আজ সেই বাহিনীর সদস্যদের ওপরই জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা নগ্ন হামলা চালানোর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।

র‍্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ.আর.এম. মোজাফফর হোসেনের পাঠানো বার্তায় আমরা জানতে পারি, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের চারজন সদস্য গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতেলে নেয়ার পর একজন শাহাদাত বরণ করেন।

আমরা অত্যন্ত ক্ষোভ ও বেদনার সাথে জানাচ্ছি যে, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া এই বীর শহীদ কর্মকর্তা হলেন র‍্যাবের ডিএডি মোতালেব; তিনি বিজিবি থেকে র‍্যাবে এসেছিলেন। আমরা একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে শহীদ ডিএডি মোতালেবের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আজ শুধু মোতালেবের পরিবার স্বজন হারায়নি, রাষ্ট্র তার এক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শাহাদাত কি এড়ানো যেত না? বছরের পর বছর ধরে জঙ্গল সলিমপুরকে ‘নিষিদ্ধ নগরী’ হয়ে ওঠার সুযোগ কারা করে দিয়েছে? সীতাকুণ্ডের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকাটি আজ সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’র নেতা ইয়াসিন মিয়া এবং ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’-এর নেতা কাজী মশিউর ও গাজী সাদেকের মতো চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এখানে হাজার হাজার মানুষকে জিম্মি করে এক মগের মুল্লুক কায়েম করেছে। এই নেতারা সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বাণিজ্য চালাচ্ছে, আর নিজেদের রক্ষার জন্য গড়ে তুলেছে সশস্ত্র বাহিনী। আজ তাদের গুলিতেই রাষ্ট্রের একজন অফিসারকে প্রাণ দিতে হলো।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বছরের পর বছর ছাড় দিতে দিতে তারা এতটাই বেপরোয়া হয়েছে যে, এখন খোদ র‍্যাবের ওপর গুলি চালাতে তাদের হাত কাঁপে না। এই ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি জমি কি বাংলাদেশের মানচিত্রের বাইরে? এখানকার ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে ইয়াসিন মিয়া, কাজী মশিউর ও গাজী সাদেকের মতো গুটিকয়েক লোক, আর রাষ্ট্র তা চেয়ে চেয়ে দেখছে।

অতীতের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রশাসনের নমনীয়তাই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ২০২৩ সালে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর যখন নারকীয় হামলা চালানো হয়েছিল, তখনই যদি এই বিষফোঁড়া উপড়ে ফেলা হতো, তবে আজকের দিনটি দেখতে হতো না। সাংবাদিকরা সেখানে সংবাদ সংগ্রহে গেলে হামলার শিকার হন, পরিবেশ অধিদপ্তর গেলে মার খায়, পুলিশ গেলে আক্রান্ত হয়।

এই এলাকাটি চট্টগ্রাম শহরের খুব কাছে হওয়ায় এটি এখন অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। শহরে বড় বড় অপরাধ সংঘটিত করে সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুরে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, আর সেখান থেকে কলকাঠি নাড়ছে। এটি চলতে দেওয়া মানে নিজের ঘরে সাপ পুষে রাখা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা কবে বুঝবেন যে, জঙ্গল সলিমপুরের পরিস্থিতি এখন সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করে গেছে?

এখন আর কোনো তদন্ত কমিটি বা দায়সারা অভিযানের সময় নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করার সময় এসেছে। আমাদের দাবি স্পষ্ট—অবিলম্বে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটিকে চারদিক থেকে সম্পূর্ণরূপে ঘিরে ফেলতে হবে। সেখানে বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্যের সকল সাপ্লাই লাইন বন্ধ করে দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। ভেতরে অবস্থানরত প্রতিটি মানুষের পরিচয় যাচাই করতে হবে, যাতে সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে পালাতে না পারে। যারা অবৈধভাবে পাহাড় দখল করে আছে এবং যারা এই সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে।

ডিএডি মোতালেবের রক্ত যেন বৃথা না যায়। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, সন্ত্রাসীদের শক্তি রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি নয়। জঙ্গল সলিমপুরকে সম্পূর্ণ অস্ত্রমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত না করা পর্যন্ত এই অভিযান থামানো যাবে না। শহরের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জঙ্গল সলিমপুরের এই জঞ্জাল সাফ করা এখন সময়ের দাবি।

আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি হতে দেখতে চাই না, আমরা আর কোনো শহীদের কফিনে স্যালুট জানাতে চাই না, আমরা চাই অবিলম্বে এই সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হোক।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।