
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ এখন আর কেবল আদালত চত্বর বা রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও। বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ও আইনি জটিলতা নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের দুই প্রার্থীর আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি স্ট্যাটাস এখন ফটিকছড়ির ‘টক অব দ্য টাউন’। এই ভার্চুয়াল যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকরাও, যা নির্বাচনী পরিবেশকে করে তুলেছে চরম উত্তেজিত।
ঘটনার সূত্রপাত সরওয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিলের লক্ষ্যে জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিনের একের পর এক আইনি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে একটি ঝাঁজালো স্ট্যাটাস দেন বিএনপি প্রার্থীর আইনজীবী ইউসুফ আল মাসুদ। তিনি লিখেন, সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ঠেকাতে এই পর্যন্ত ৪টি মামলা করেছেন জামায়াতের প্রার্থী নুরুল আমিন। টাকা পাবে ব্যাংক, অথচ সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করে জামায়াত প্রার্থী। ওনাকে মামলাবাজ বলা যাবে কি না?
আইনজীবী ইউসুফ আল মাসুদের এই প্রশ্নের জবাব দিতে দেরি করেননি জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিনের আইনজীবী ইসমাইল গণি। তিনি পাল্টা স্ট্যাটাসে লিখেন, নির্বাচন কমিশনের আইনে ঋণখেলাপি ব্যক্তি সংসদ সদস্য প্রার্থীর অযোগ্য। সংক্ষুব্ধ অপর যেকোনো প্রার্থী মামলা করার অধিকার রাখেন। নির্বাচন কমিশনের আইন সেই অধিকার দিয়েছে। নির্বাচনের অযোগ্য ব্যক্তির সাথে কেন নুরুল আমিন নির্বাচন করবেন? আপনাদের প্রার্থী শত শত কোটি টাকার ঋণখেলাপি; সেটা সুপ্রিম কোর্টের আদেশেই প্রমাণিত।
দুই আইনজীবীর এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ইউসুফ আল মাসুদের পোস্টে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের বন্যা বয়ে যায়, পিছিয়ে ছিল না ইসমাইল গণির পোস্টও। মন্তব্যের ঘরে উভয় শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা জড়িয়ে পড়েন তীব্র বাগযুদ্ধে।
বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মো. হালিম মন্তব্য করেন, আলমগীরের মাঠের জনপ্রিয়তা দেখে ভয় পেয়ে তারা মামলার আশ্রয় নিয়েছেন। গুণী মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে ষড়যন্ত্রকারীরা টিকতে পারবে না।
এম এ সুজন তালুকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেন, ৫ আগস্টের পরে আ. লীগের বিরুদ্ধে একটা মামলা করার হেডাম ছিল না। যিনি দীর্ঘ সময় রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাই ওনার পেছনে ষড়যন্ত্র করছেন। নিঃসন্দেহে মামলাবাজ।
স্থানীয় ভোটার ও সমর্থকদের মন্তব্যে উঠে এসেছে এলাকার রাজনীতির নানা সমীকরণ। মো. সাহেদুল আলম চৌধুরী লেখেন, জামায়াতের এই প্রার্থীকে কখনো ফটিকছড়ি দেখিনি। ১৭ বছরে ১৭ জন মানুষের উপকার তো দূরের কথা, ১৭ মিনিটের জন্য তাকে দেখেনি। উনার চেয়ে বাড়ির পাশে আরেক প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিম ভালো।
খেলার পরিভাষা ব্যবহার করে মেহেদি হাসান লিখেন, আলমগীর ফুলটাইম স্ট্রাইকার। এই মামলাবাজের সব প্লানিং ভেস্তে যাবে এবং ভোটাররা মামলাবাজ নুরুল আমিনকে লাল কার্ড দেবে ইনশাআল্লাহ।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন তার সমর্থকরা। এস কে আহমেদ ফারুকী লিখেন, ব্যাংকের টাকা মানে জনগণের টাকা। দেশের নাগরিক হিসেবে তিনিও অবশ্যই সংক্ষুব্ধ।
আইনজীবী মো. হাসান বিএনপি প্রার্থীর আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, উনি যদি মামলাবাজ হন; আপনি তো একজন দুর্নীতিবাজ। দেশের টাকা পাচারকারীর পক্ষে আইনি লড়াই করছেন। আইনজীবী হিসেবে আপনাকে কী বলা যাবে?
আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে মো. আবদুল মালেক মন্তব্য করেন, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অযোগ্য। এটা নির্বাচন কমিশনের আইন। যে কেউ চাইলে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধেও এসব খতিয়ে দেখতে পারেন।
এস এম সানভি বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেন, অবাক লাগে যখন একজন ঋণখেলাপি মামলার আসামির পক্ষেও দেশের এত সচেতন নাগরিক থাকে। আর ব্যাংক টাকা পাবে মানে জনগণের টাকা।
মো. শাহরিয়া নাফিজ শুভ নির্বাচনের আইনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আইনে স্পষ্ট বলা আছে সংক্ষুব্ধ যেকোনো প্রার্থী এ বিষয়ে মামলার অধিকার রাখেন। আপনাদের প্রার্থী শত শত কোটি টাকার ঋণখেলাপি। আইন যখন স্পষ্ট, তখন অবৈধ প্রার্থিতার পক্ষে দাঁড়ানো কি আদৌ নৈতিক?
এছাড়া নুরুল আলম বৈরাগী বিএনপি প্রার্থীর আইনজীবীর সমালোচনা করে লিখেন, ইউসুফ সাহেব, আপনাদের মতো আইনজীবীদের লজ্জা থাকা উচিত। একজন ঋণখেলাপির পক্ষে লড়তে আপনাদের বিবেকে বাধা দেয় না!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনি লড়াই আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কাদা ছোড়াছুড়ি নির্বাচনী পরিবেশের জন্য শোভন নয়। তারা নেতাকর্মীদের সংযত হয়ে আদালতের রায়ের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ফটিকছড়ি আসনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এই আইনি লড়াই এখন হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ—উভয় ক্ষেত্রেই বিচারাধীন। আগামী বৃহস্পতিবারের শুনানির ওপরই নির্ভর করছে সরওয়ার আলমগীরের নির্বাচনী ভাগ্য।