
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের বয়সের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে প্রবীণ প্রার্থীর সংখ্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর হলফনামা বিশ্লেষণে রাজনীতিতে এই ‘জেনারেশন শিফট’ বা প্রজন্মগত পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রার্থীর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশে। গত নির্বাচনে (২০২৪) এই হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থীর হার গত নির্বাচনের ২৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে কমে এবার ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
টিআইবি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২৫-৩৫ বছর বয়সী প্রার্থী ছিল মাত্র ০ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে এই বয়সের কোনো প্রার্থীই ছিল না। অথচ এবার মোট প্রার্থীর প্রায় ১০ শতাংশই এই তরুণ প্রজন্মের। বিপরীতে, প্রবীণ বা ৬৫-ঊর্ধ্ব প্রার্থীর সংখ্যা ২০১৪ সালে ছিল ৬৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ৪১ দশমিক ৫০ শতাংশে এবং ২০২৪ সালে ২৫ দশমিক ৬৭ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা আরও কমে ১৭ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে।
কেন বাড়ছে তরুণ প্রার্থী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, তরুণ প্রার্থীদের এই সংখ্যাবৃদ্ধি বৃহত্তর জনতাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। রাজনীতিসহ সমাজের সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ নেতৃত্বের যে উত্থান ঘটেছে, তা একটি বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের ব্যবহার করলেও নেতৃত্বের সামনের সারিতে আসতে দেয়নি। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান তাদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে।”
অধ্যাপক সাব্বির আরও বলেন, অভ্যুত্থানে তরুণদের ত্যাগ ও সাহসিকতা বাংলাদেশে অনুপ্রেরণার নতুন উৎস তৈরি করেছে।
অন্যান্য বয়সের চিত্র
টিআইবি’র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৪ সালে এই হার ছিল ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা এবার বেড়ে ১৯ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী প্রার্থী ২০১৪ সালের ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে এবার ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে ৫৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত নির্বাচনে এই হার ছিল ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা এবার ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
নতুন মুখের জয়জয়কার
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৬৯৬ জনই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অর্থাৎ সিংহভাগ প্রার্থীই নবীন।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের পতনে তরুণরাই ছিল মূল চালিকাশক্তি। নির্বাচনের এই চিত্রে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে। রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি।
তিনি বলেন, “আশা করি অনেক তরুণ প্রার্থী নির্বাচনে বিজয়ী হবেন। মানুষ চায় আগামী সংসদ হোক তারুণ্যনির্ভর এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম।” তবে তিনি এ-ও স্মরণ করিয়ে দেন, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাও ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ দলীয় এবং ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী।