
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থার কারণে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। গত কয়েক দিনের কর্মবিরতির ফলে অনেক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের পণ্য সঠিক সময়ে জাহাজে উঠতে পারেনি। ঢাকার ট্যাড সোর্সিং লিমিটেড নামের একটি বায়িং হাউসের ১২০ কনটেইনার তৈরি পোশাক বন্দরে আটকা পড়ে আছে। গত সপ্তাহে বন্দরের কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে এসব পণ্য জাহাজে ওঠেনি। ফলে সিঙ্গাপুর বন্দরের নির্ধারিত বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল ধরতে পারেনি এই বিপুল পরিমাণ পণ্য।
ট্যাড সোর্সিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারে জার্মানির দুটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক রয়েছে। দু–এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তাদের বিপদে পড়তে হবে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে যোগাযোগ শুরু করেছে।
শুধু ট্যাড সোর্সিং নয়, দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও চরম বিপাকে পড়েছে। গ্রুপটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, তাদের ৮০০-র বেশি কনটেইনার কাঁচামাল বন্দরে আটকে আছে। এতে প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিকসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ২৫০ কনটেইনার রপ্তানি পণ্য ডিপোতে পড়ে আছে, যার মধ্যে খাদ্যপণ্যও রয়েছে। এসব পণ্য সময়মতো জাহাজে না উঠলে বিদেশি ক্রেতারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।
পোশাক খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপের দেড় লাখ পিস তৈরি পোশাক বন্দরে পড়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাদের আরও ৯ লাখ এবং ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরও ১৪ লাখ পিস পোশাক বন্দরে যাওয়ার কথা। এসব পোশাকের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময়টি গ্রীষ্মকালীন পোশাক রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।
সাভারের এন আর ক্রিয়েশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলকাস মিয়া জানান, তাদের তিন লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য দুই দিন অপেক্ষার পর ডিপোতে দেওয়া গেলেও জাহাজে ওঠেনি। ডিপোর বাইরে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় ইতোমধ্যে তাকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এমনিতেই ক্রয়াদেশ কম, তার ওপর বন্দরের অচলাবস্থার জন্য লোকসান গুনতে হলে সেটি হবে ভয়াবহ।
ডিপো পরিস্থিতি ও স্বাভাবিক হওয়ার চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রাম বন্দরে দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করা হলেও জট কাটাতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির হিসাবে, আন্দোলন শুরুর আগে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানির অপেক্ষায় ছিল প্রায় ৮ হাজার একক কনটেইনার। বৃহস্পতিবার বিকেলে কর্মসূচি প্রত্যাহারের আগপর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১১ হাজারে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, কর্মসূচি স্থগিতের পর বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে নেওয়া শুরু হয়। তবে নতুন করে কর্মবিরতি না হলেও জট কাটিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগবে।
উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এই কর্মবিরতি চলছিল। গত শনিবার থেকে তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের বিবৃতি
চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ ১০ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিষয়টি সুরাহা করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিটিএমএর কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকের পর বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), মেট্রো চেম্বার, ঢাকা চেম্বার, বিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিজিবিএ, বিজিএপিএমইএ ও বিটিটিএলএমইএ যৌথ বিবৃতি দেয়।
বৈঠক শেষে বিইএফের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান এবং ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। যৌথ বিবৃতিতে আন্দোলনরত শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্দেশে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, আপনাদের দাবিদাওয় সরকারের কাছে পৌঁছানোর অধিকার আপনাদের আছে। তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকে নিজেই বিপদে ফেলা। আমরা আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই, দেশের অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই ব্যতিক্রমী অবস্থান থেকে সরে আসুন।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তাই বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে পুরো অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।