সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বিএনপি-জামায়াতের ‘পাখির চোখ’ আ.লীগের ভোটে

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২:২৪ অপরাহ্ন

bnp jamaat
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অগ্রাধিকার খাত বা ইশতেহারে ভিন্নতা থাকলেও জয়ে ফিরতে দুই দলের কৌশল এখন এক বিন্দুতে মিলেছে। নির্বাচনের মাঠে নিষিদ্ধ ঘোষিত ও কোণঠাসা আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক বাগে আনাই এখন বিএনপি ও জামায়াতের প্রধান লক্ষ্য। দুই দলই মনে করছে, আওয়ামী লীগের ভোট টানতে পারলে একদিকে যেমন জয়ের পথ সুগম হবে, অন্যদিকে ভোট পড়ার হারও সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা যাবে।

দলীয় ও জোটের নিজস্ব ভোটের চেয়েও আওয়ামী লীগের নীরব ভোট এখন বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীদের কাছে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে মাঠপর্যায়ে নানামুখী কৌশল নিয়েছে দল দুটি। এর মধ্যে প্রধান কৌশল হলো—আগামী পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করার নিশ্চয়তা দেওয়া। আবার কোথাও কোথাও এই নিশ্চয়তায় কাজ না হলে প্রচ্ছন্ন হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি স্বীকারও করছেন দল দুটির শীর্ষ নেতারা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ভোটে কিছু কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। বিএনপিও এর বাইরে নয়। আমরা ভোটার হিসেবেই সবাইকে মূল্যায়ন করি। তবে দলটির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ব্যক্তিগতভাবে এটাকে আমি সমর্থন করি না। তবে নির্বাচনে জিততে নানা কৌশল নিতে হয়, সেক্ষেত্রে হয়তো কোথাও কোথাও এমনটা হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত দুই দলই এটা করছে।

তবে আদর্শিক জায়গা থেকে এই কৌশলকে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া ও বুর্জোয়া রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের রাজনীতি আদর্শবাদী রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, এটা ভোটের কৌশল হতে পারে, কিন্তু বিএনপি-জামায়াত যা করছে তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল।

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি ‘রাষ্ট্র মেরামতে’ ৩১ দফাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণদের কর্মসংস্থান, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন ও বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি। নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির রাজনৈতিক অঙ্গীকার তরুণ ও যুবসমাজকে আকৃষ্ট করছে। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ডসহ জনমুখী সেবা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে তাদের। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও নিরাপত্তা সেল গঠনের কথাও বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে বিএনপির, যা তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’-এর অংশ বলে দাবি নেতাদের। আজ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার ঘোষণার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের ইশতেহারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রতিনিধি রাখার প্রতিশ্রুতি। যদিও আসন্ন নির্বাচনে দলটি একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি এবং সম্প্রতি দলটির আমিরের নারী নেতৃত্ব বিষয়ক মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তবুও ইশতেহারে নারীদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত সংস্কার, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং পাসপোর্ট ও এনআইডি সেবার মানোন্নয়ন করা হবে। এমনকি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার অঙ্গীকারও করেছে জামায়াত, যা দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

পরিশেষে দেখা যাচ্ছে, ইশতেহারে তারুণ্য কিংবা ধর্মের কথা বলা হলেও, মাঠের রাজনীতিতে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীই এখন তাকিয়ে আছে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের দিকে।