
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটের মাঠে কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপক দাপট রয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির ৯৫ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ৭৮ শতাংশ প্রার্থীই কোটিপতি। তবে বিত্তবানদের এই দাপটের বিপরীতে ৪১ শতাংশ প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকারও কম।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। এ সময় সংস্থার প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সুজনের তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীই কোটিপতি। বিশেষ করে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে বিত্তের প্রভাব প্রকট। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির ২৭৬ জন প্রার্থী (৯৫ দশমিক ১৭ শতাংশ) এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৭৮ জন প্রার্থী (৭৮ দশমিক ৪১ শতাংশ) কোটিপতি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও ১৮৮ জন (৬৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ) কোটিপতি রয়েছেন।
সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, টাকার পাহাড়ের নিচে সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীরা দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। রাজনীতি যখন ধনিক শ্রেণির করায়ত্ত হয়, তখন সাধারণের জন্য মাঠ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
হলফনামায় দেওয়া বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেছে সুজন। এতে প্রথম অবস্থানে রয়েছেন কুমিল্লা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকারিয়া তাহের। তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। প্রায় ৪০ কোটি টাকা আয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন টাঙ্গাইল-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম। তৃতীয় অবস্থানে থাকা লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারীর বার্ষিক আয় প্রায় ১৯ কোটি টাকা।
তালিকায় চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছেন যথাক্রমে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস (৯ কোটি টাকার বেশি) এবং টাঙ্গাইল-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর (৮ কোটি টাকার বেশি)। শীর্ষ আয়ের তালিকায় থাকা অন্যান্যেরা হলেন—কক্সবাজার-১ আসনের সালাহউদ্দিন আহমদ (বিএনপি), কুমিল্লা-৫ আসনের মো. জসীম উদ্দিন (বিএনপি), নেত্রকোনা-১ আসনের কায়সার কামাল (বিএনপি), চট্টগ্রাম-১৪ আসনের শফিকুল ইসলাম রাহী (স্বতন্ত্র) এবং কুমিল্লা-৭ আসনের রেদোয়ান আহমেদ (বিএনপি)।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মোট ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন (২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ) ঋণগ্রহীতা। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে ৭৫ জনের (১৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ)। দলভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রহীতা প্রার্থী বিএনপির (১৬৭ জন)।
কোটিপতিদের দাপট থাকলেও মোট প্রার্থীর ৪১ দশমিক ০৬ শতাংশ বা ৮৩২ জনের বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার নিচে। ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয় করেন ৭৪১ জন (৩৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ)।
তবে শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে এবারের প্রার্থীরা বেশ এগিয়ে। প্রায় ৭০ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী। এছাড়া আয়কর রিটার্ন দাখিলের হারও আগের চেয়ে বেড়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রার্থী আয়কর বিবরণী জমা দিলেও এবার তা বেড়ে ৬৫ দশমিক ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সুজনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষাগত যোগ্যতায় প্রার্থীরা উজ্জ্বল হলেও রাজনীতির এই ‘ব্যবসায়িকীকরণ’ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুস্থ ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের জন্য এই আর্থিক বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।