
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সোনাইমুড়ী অংশে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৪টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লা সীমান্তঘেঁষা কেন্দ্রগুলো নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আশ্বাস সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা কাটছে না।
সোনাইমুড়ী উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৬৯টি। এখানে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫১১ জন ভোটার। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন্দ্রগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে নিরাপত্তা ছক তৈরি করেছে।
প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, ৬৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১১টিকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ১৩টিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ৩টি কেন্দ্র ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’, ১টি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ৪১টি কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।
থানা থেকে কেন্দ্রের দূরত্বের বিষয়টিও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। থানা থেকে ১ থেকে ৪ কিলোমিটারের মধ্যে ২৬টি কেন্দ্র থাকলেও ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে দুর্গম ২টি কেন্দ্র—দেওটি ইউনিয়নের পতিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঘাসেরখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সীমানা নিয়ে যত ভয়
উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের সঙ্গে কুমিল্লা জেলার সীমানা থাকায় এসব এলাকাকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চাষীরহাট ইউনিয়ন সরাসরি কুমিল্লা সীমানায়। জয়াগ ইউনিয়ন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ এবং আমিশাপাড়া ইউনিয়ন যৌথভাবে মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত।
স্থানীয় ভোটারদের আশঙ্কা, নির্বাচনের দিন সহিংসতা ঘটিয়ে দুর্বৃত্তরা সহজেই সীমানা পেরিয়ে কুমিল্লায় পালিয়ে যেতে পারে। প্রশাসনের তালিকায় সীমানাঘেঁষা কাবিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং পোরকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটের মাঠে রাজনৈতিক উত্তাপ
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) নদনা ইউনিয়নে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। এর আগে সোনাইমুড়ী পৌর এলাকায় জামায়াতের এক নারী কর্মীকে হেনস্তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
যদিও বিএনপি নেতারা সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছেন। তবে দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও মাঠের উত্তেজনা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. ছাইফ উল্যাহ সংবাদ সম্মেলনে সোনাইমুড়ী পৌরসভাসহ ছয়টি ইউনিয়নের ১৯টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দাবি করেছেন।
অবৈধ অস্ত্র ও অতীত অভিজ্ঞতা
ভোটারদের শঙ্কার বড় কারণ গত ৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভোটের দিন আধিপত্য বিস্তারে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে। নদনা ইউনিয়নে সম্প্রতি দুই পক্ষের দেশীয় অস্ত্রের মহড়া সেই শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া অতীতে সোনাইমুড়ী পৌরসভার বাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নদনার কালুয়াই, বজরার ছনগাঁও ও বারাহিনগর কেন্দ্রে সহিংসতার রেকর্ড থাকায় এবারও সেখানে বাড়তি নজরদারির দাবি উঠেছে।
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
ভোটারদের আশ্বস্ত করতে প্রশাসন ও সেনাবাহিনী তৎপর রয়েছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে মহাসড়কে সেনাবাহিনীর সুসজ্জিত মহড়া দেখা গেছে। সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ৩ জন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির টহল থাকবে।’
নোয়াখালীতে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর উপ-অধিনায়ক মেজর রেজাউর রহমান বাপ্পি সাংবাদিকদের জানান, যেকোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সেনাবাহিনীর ‘কুইক রিঅ্যাকশন ফোর্স’ প্রস্তুত রয়েছে। খবর পাওয়ার মুহূর্তের মধ্যে তারা আক্রান্ত কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে। এছাড়া কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের গায়ে থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা এবং প্রতিটি কেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে।