
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। হাইকমান্ড থেকে ভোট বর্জনের নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন; দলটির বিশাল ভোটব্যাংকই এখন নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের বড় সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে গেলে তা অনেক প্রার্থীর ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় তাদের ‘নিরীহ’ কর্মী ও সমর্থকদের ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে পর্দার আড়ালে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামপর্যায়ে এই অঘোষিত প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ‘মব কালচার’, হামলা ও মামলা থেকে বাঁচতে এবং এলাকায় টিকে থাকার স্বার্থে আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী-সমর্থকও পছন্দের কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
দেশের বিভিন্ন আসনে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নিরাপত্তা ও মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি ও জামায়াত নেতারা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অভয় দিয়ে বলছেন, তাদের সঙ্গে যোগ দিলে সব দায়দায়িত্ব নেওয়া হবে এবং পুলিশি হয়রানি রোধ করা হবে। পটুয়াখালী-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর দাবি করেছেন, তিনি মামলা না করায় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের শতভাগ ভোট তিনিই পাবেন।
জাতীয় এই প্রবণতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) – ‘সারভাইভাল ভোটিং’ এই আসনে বিগত দিনে আওয়ামী লীগের বড় ভোটব্যাংক ছিল নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসী। বর্তমানে এখানে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী এবং বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
জামায়াত এই আসনে বস্তিবাসী ও শ্রমিকদের ‘মব জাস্টিস’ ও উচ্ছেদ আতঙ্ক থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাছে টানার চেষ্টা করছে। স্থানীয় পাহাড়তলী ও বিশ্বকলোনি এলাকার অনেক পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা এখন জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় আসছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য—ভোটের বিনিময়ে এলাকায় নিরাপদে বসবাস করার নিশ্চয়তা। একে স্থানীয়রা ‘সারভাইভাল ভোটিং’ বা টিকে থাকার ভোট হিসেবে দেখছেন।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) – নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে জামায়াত অধ্যুষিত এই জনপদে বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের উল্লেখ করার মতো অবস্থান ছিল। বর্তমানে এখানে হেভিওয়েট প্রার্থী জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী এবং বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমিনের মধ্যে লড়াই হচ্ছে।
সাতকানিয়ার প্রত্যন্ত ইউনিয়নগুলোতে (যেমন: সোনাকানিয়া, মাদার্শা) আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরা অদ্ভুত এক সমীকরণে পড়েছেন। তারা বলছেন, “আমাদের নেতারা পলাতক। এখন এলাকায় থাকতে হলে জেতার সম্ভাবনা যার বেশি, তার সঙ্গেই থাকতে হবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আসনে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো মূলত ‘অ্যান্টি-বিএনপি’ সেন্টিমেন্ট থেকে জামায়াতের বাক্সে, অথবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে বিএনপির দিকে যেতে পারে। এখানে আদর্শের চেয়ে ‘মামলা ও হামলা থেকে বাঁচার নিশ্চয়তা’ বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) – ব্যবসায়িক সুরক্ষা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী লড়ছেন। বন্দর ও ইপিজেড এলাকার শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি বড় অংশ এতদিন ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা করেছেন।
সাম্প্রতিক প্রচারণায় দেখা গেছে, বিএনপি এখানে ব্যবসায়ীদের ‘চাঁদাবাজি মুক্ত’ ব্যবসার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতও এখানে নীরব প্রচারণায় সক্রিয়।
পতেঙ্গা এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, ভোটের পর ব্যবসার সুরক্ষার স্বার্থে যারা ক্ষমতায় আসার দৌড়ে এগিয়ে, তাদেরই সমর্থন দিচ্ছেন তারা। অর্থাৎ, এখানেও আওয়ামী লীগের ‘ব্যবসায়ী ভোটব্যাংক’ এখন বিজয়ী হতে যাওয়া দলের দিকে ঝুঁকছে।
সার্বিক বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম বলেন, কারো ভোটব্যাংক ভাঙা তাদের কাজ নয়, তারা আদর্শের ভিত্তিতে ভোট চান।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি এই কৌশল সমর্থন না করলেও নির্বাচনী প্রয়োজনে কোথাও কোথাও এমনটা হতে পারে।