সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কক্সবাজারে বিএনপির ‘ক্লিন সুইপ’ কি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ফল?

‘ভাইরাল আবছার’ পেলেন মাত্র ৩৬৭ ভোট, জামানত হারালেন অনেকে
এম. জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ৭:২২ অপরাহ্ন


পর্যটন নগরী কক্সবাজারের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে বিএনপি। জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই দলটির মনোনীত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে ‘ক্লিন সুইপ’ বা নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করল দলটি। নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সালাহউদ্দিন আহমদ, আর উখিয়া-টেকনাফে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে শেষ হাসি হেসেছেন শাহজাহান চৌধুরী।

শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা রিটার্নিং অফিসার মো. আ. মান্নান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করেন। ফলাফলে দেখা যায়, জেলার চারটি আসনেই মূল লড়াই হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তবে ভোটের সমীকরণে জামায়াত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি কোনো আসনেই।

রেকর্ড ভোটে সালাহউদ্দিনের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের বিজয় ছিল অনেকটা প্রত্যাশিত। তবে ভোটের ব্যবধান সবাইকে চমকে দিয়েছে। এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪০ হাজার ৪৯০ জন। পোস্টাল ব্যালটসহ ১৭৮টি কেন্দ্রের ফলাফলে সালাহউদ্দিন আহমদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ১৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুখ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৭২৮ ভোট। প্রায় ৯২ হাজার ভোটের ব্যবধানে এই বিজয় সালাহউদ্দিনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়। এখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. সারওয়ার আলী কুতুবী হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ৪ হাজার ৫২৮ ভোট। মোট প্রদত্ত ভোটের হার ৬৭.০৬ শতাংশ।

উখিয়া-টেকনাফে শ্বাসরূদ্ধকর লড়াই

জেলার অন্য আসনগুলোতে বড় ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হলেও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে ছিল ভিন্ন চিত্র। এখানে ভোটের লড়াই চলেছে সমানে সমান। শেষ পর্যন্ত মাত্র দেড় হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৮২ ভোট। তাঁর ঘাড়েই নিঃশ্বাস ফেলছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নূর আহমদ আনওয়ারী, যিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৩৩ ভোট। হাড্ডাহাড্ডি এই লড়াইয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নুরুল হক পেয়েছেন ৪ হাজার ৩৩৮ ভোট এবং এনডিএম-এর সাইফুদ্দিন খালেদ পেয়েছেন ৩৭৯ ভোট। এই আসনে ভোট পড়ার হার ৬৭.৯৪ শতাংশ।

মহেশখালী ও সদরেও বিএনপির আধিপত্য

দ্বীপ উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনেও বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫১ ভোটারের এই আসনে ১২৫টি কেন্দ্রের ফলাফলে বিএনপির আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৮৯ ভোট। এখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জিয়াউল হক ৮ হাজার ৭৯৯ ভোট, জাতীয় পার্টির মো. মাহমুদুল হক ৭৫৭ ভোট এবং গণঅধিকার পরিষদের এস এম রোকনুজ্জামান খান ১৯৭ ভোট পেয়েছেন। ভোট পড়ার হার ৬০ শতাংশ।

অন্যদিকে কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনেও জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছেন বিএনপির লুৎফুর রহমান। ১৮৩টি কেন্দ্রের ফলাফলে তিনি ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর শহীদুল আলম বাহাদুর পেয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৮২৭ ভোট। এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুল ইসলাম ৫ হাজার ১৪৯ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া ৯৪৭ ভোট এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির জগদীশ বড়ুয়া ৬০২ ভোট পেয়েছেন।

সবচেয়ে কম ভোট ‘ভাইরাল আবছারের’

নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উঠে এসেছে কক্সবাজার-৩ আসন থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ ও আমজনতা দলের প্রার্থী নুরুল আবছার ওরফে ‘ভাইরাল আবছার’ প্রজাপতি প্রতীকে মাত্র ৩৬৭ ভোট পেয়েছেন। জেলার সব প্রার্থীর মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন ভোটপ্রাপ্তির রেকর্ড। জামানত হারানো প্রার্থীদের তালিকায় তাঁর নাম সবার ওপরে।

জেলা প্রশাসনের ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, কক্সবাজারের রাজনীতিতে বিএনপি তাদের সাংগঠনিক শক্তির চূড়ান্ত মহড়া দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রতিটি আসনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও জোটগত রাজনীতির বাইরে এসে এককভাবে আসন উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে।