
দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৫ শতাংশই ১০ কোটি টাকার কম অঙ্কের ছোট ও মাঝারি ঋণ। উচ্চসুদ হওয়া সত্ত্বেও এসব ঋণের ২৫ শতাংশ খেলাপি হয়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি খেলাপির হার ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে বিতরণ করা ঋণের ধরন ও খেলাপির হার সম্পর্কে এই চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের অঙ্ক যত বড়, খেলাপির পরিমাণও তত বেশি। আর ছোট ও মাঝারি ঋণে খেলাপি তুলনামূলক অনেক কম।
প্রতিবেদনের তথ্য ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নিলেও তা পরিশোধে অত্যন্ত তৎপর থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগও কম। অন্যদিকে, বড় অঙ্কের ঋণের গ্রাহকরা কম সুদে ঋণ পেয়েও তা ফেরতে নানা গড়িমসি করেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধ না করে তারা উল্টো নানা ধরনের ছাড় আদায় করে নেন।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তথ্য প্রমাণ করে যে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এখনো বড় ভূমিকা রাখছেন ছোট ও মাঝারি গ্রাহকরা। এর বিপরীতে বড় গ্রাহকদের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির পাশাপাশি অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, যা পুরো ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য বড় হুমকি।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহসান জামান চৌধুরী জানান, বড় গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ থাকে, যার কারণে অনেকেই মনে করেন ঋণ নেওয়ার পর আর ফেরত দিতে হবে না। এটি এখন দেশের জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধান এবার না হলে আর কখনো হবে না; আর সমাধান না হলে আর্থিক খাতের অবস্থা আরও খারাপ হবে। তিনি আরও জানান, ছোট ও মাঝারি গ্রাহকরা পুরোপুরি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল বলে যেকোনো উপায়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকেন এবং ঋণ ঠিক রাখেন। মূলত তারাই অর্থনীতি সচল রেখেছেন এবং ভালো কর্মসংস্থান তৈরি করছেন।
ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা করে টিকে থাকেন এবং ব্যবসার বাইরে তাদের মনোযোগ কম থাকায় তারা ভালো করছেন। তাদের জন্য নানা সুবিধা চালু করা হয়েছে জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, এসব উদ্যোক্তার কারণে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের খেলাপির চেয়ে অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশই খেলাপি। এর মধ্যে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (খেলাপি ১৫ দশমিক ২ শতাংশ)। ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা (খেলাপি ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ)। এই হিসাবে ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে গড় খেলাপির হার ২১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপির হার ৪৮ শতাংশ। ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে এই হার ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৩১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হলো ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণ, আর বড় অঙ্কের এসব ঋণে খেলাপির হার সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হয় ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। এর বাইরে প্রচলিত ধারার কিছু ব্যাংকেও বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে, ফলে এসব ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে যায়।
দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপির দিক থেকে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক (৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ), পদ্মা ব্যাংক (৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ) ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক (৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ)।
খেলাপি ঋণে জর্জরিত এসব ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্প্রতি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি চারটি চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।