
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট এ সংক্রান্ত একটি রুল জারি করে জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছেন। এর ফলে পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে আদালতের এই রুলের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বব্যাপী নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। মঙ্গলবার থেকে নতুন এই শুল্ক কার্যকর হবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ওভাল অফিসে বসে এই নির্বাহী আদেশে সই করেছেন এবং এটি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই কার্যকর হবে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসে ঘোষিত ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কের বেশিরভাগকে সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অন্য আইনের বলে নতুন শুল্ক পরিকল্পনার কথা জানান। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ৬-৩ ভোটে দেওয়া রায়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ১৯৭৭ সালের ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করতে গিয়ে তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
আদালতের এই সিদ্ধান্ত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং যেসব মার্কিন রাজ্য ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, তাদের জন্য বড় জয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র যাদের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছে, তা ফেরত দেওয়ার পথ খুলবে। তবে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আইনি লড়াই ছাড়া শুল্কের মাধ্যমে নেওয়া অর্থ ফেরত যাবে না এবং এই আইনি লড়াই শেষ হতে কয়েক বছরও লাগতে পারে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসসহ সুপ্রিম কোর্টের যে ৬ বিচারক ট্রাম্পের শুল্কের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের মধ্যে তিন উদারপন্থির পাশাপাশি ট্রাম্পের নিজের নিয়োগ দেওয়া দুই বিচারক অ্যামি কনে ব্যারেট ও নেইল গোরসাচও আছেন। তবে তিন রক্ষণশীল বিচারক ক্লারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানহ ও স্যামুয়েল আলিতো সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন।
নিজ হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় তাদের নিয়ে ‘ভীষণ লজ্জিত’ বলে মন্তব্য করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ওই বিচারকরা বোকা ও তোষামোদে লিপ্ত এবং তাদের দেশপ্রেম একেবারেই নেই। তারা সংবিধানের প্রতিও অনুগত নয়।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরই ট্রাম্প ধারা ১২২ নামে পরিচিত, কখনো ব্যবহৃত না হওয়া একটি আইনের অধীনে নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ওই আইনে প্রেসিডেন্টকে দেড়শ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যেই মার্কিন কংগ্রেসকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ট্রাম্পের এই আদেশে কিছু খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কমলা, গরুর মাংসের মতো কৃষিজাত পণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস এবং নির্দিষ্ট কিছু গাড়িসহ অনেক পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কোন কোন পণ্য এই ছাড় পাবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) অধীনে কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্যই এই ছাড়ের আওতায় থাকবে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার রায়ে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কংগ্রেসকে, প্রেসিডেন্টকে নয়। আদালতের মতে, আইইইপিএ আইনে প্রেসিডেন্টকে যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে অসীম সময়ের জন্য শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই রায়ের কারণে যেসব বিদেশি রাষ্ট্র এত দিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকাচ্ছিল, তারা এখন রাস্তায় নেচে বেড়াচ্ছে, তবে এই নাচ বেশি দিন স্থায়ী হবে না। এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারের দাম বেড়ে যায় এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ করে।