চারিদিকে কান্নার রোল। শাকতলা মান্নান ড্রাইভার বাড়ির উঠানে শত শত নারী-পুরুষের ঢল। সকলেই এসেছেন এই বাড়ির মেয়ে সানজিদার মরদেহকে শেষ বিদায় জানাতে। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে পারিবারিক কলহের জেরে শ্বশুরবাড়িতে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে তার। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহ বাড়িতে পৌঁছায়। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নদনা ইউনিয়নে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আড়াই বছর পূর্বে প্রেমের টানে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সানজিদা সুলতানা সুমাইয়া ও পার্শ্ববর্তী সেনবাগ উপজেলার সালেহ উদ্দিন (২৫)। অভিভাবকরা বিষয়টি জানতে পারলে সামাজিকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। পরে তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় কন্যা সন্তান মানহা। তবে পারিবারিক কলহের জেরে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সোমবার লাশ হয়ে বাবার বাড়ি ফিরেছেন সানজিদা। পরিবারের অভিযোগ শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে হত্যা করেছে, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির দাবি সানজিদা আত্মহত্যা করেছেন।
পরিবারের অভিযোগ ও পুলিশের ভূমিকা
নিহতের বাবা মো. মহসিন জানান, গত দেড় মাস ধরে পারিবারিক বিষয় নিয়ে শ্বশুরবাড়ির সাথে সানজিদার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। ঘটনার দিন দেবরের বিয়েতে অংশগ্রহণ করতে না চাওয়ায় তার শ্বশুর তাকে মারধর ও গালিগালাজ করেন। এই ঘটনা মুঠোফোনে বাড়িতে জানানোর পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। এর ঘণ্টাখানেক পর সানজিদার শ্বশুরবাড়ি থেকে ফোন করে জানানো হয় যে সানজিদা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছেন। সেখানে গিয়ে মেয়েকে মৃত ও মেঝেতে শোয়ানো অবস্থায় পান বলে জানান তিনি। এ সময় ওই বাড়িতে সেনবাগ থানা পুলিশ উপস্থিত ছিল। সেখানে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য ওসি চাপ প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগ করেন মো. মহসিন।
এ বিষয়ে নিহতের মা সালমা আক্তার জানান, সানজিদার শ্বশুরবাড়িতে গেলে তাদের বলা হয় মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে পুলিশ লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেনি। পরিকল্পিতভাবে তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সালমার।
মেয়েটির লাশ গোসল করিয়েছেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের প্রধান শামসুন্নাহার জানান, দেহের বিভিন্ন অংশের আঘাতের দাগ স্পষ্ট ছিল। হাত, পিঠ, কাঁধ ও গলার বিভিন্ন অংশে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে গেছে।
এই ঘটনার রাতে নিহতের পরিবার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি সেনবাগের ছাতারপাইয়া গোপালবাড়ি পৌঁছালে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে সেনবাগ থানা পুলিশ বিষয়টি সমাধান করে। তবে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করতে চাইলে থানা থেকে তা গ্রহণ করা হয়নি। ময়নাতদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে—এমনটাই জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন নিহতের বাবা।
শ্বশুরবাড়ির বক্তব্য ও ঘটনাস্থলের চিত্র
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) জুমার নামাজ শেষে সরেজমিনে নিহত সানজিদার শ্বশুরবাড়ি ছাতারপাইয়া গোপালবাড়ি পৌঁছালে সেখানে স্বামী সালেহ উদ্দিন, শ্বশুর মো. ইব্রাহিম প্রকাশ হুক্কা মিয়া ও শাশুড়ি মায়া বেগম কাউকেই পাওয়া যায়নি। বাড়িতে থাকা সালেহ উদ্দিনের বড় ভাই মাইন উদ্দিন জানান, সকলেই নামাজে গেছেন। পরবর্তীতে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করলেও তারা কেউই বাড়িতে ফেরেননি।
পরে মুঠোফোনে নিহতের স্বামী সালেহ উদ্দিনের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে সানজিদার সাথে তার শ্বশুর-শাশুড়ির মতবিরোধ হয়। পরে সানজিদা নিজের বাবার বাড়িতে চলে আসতে চাইলে সকলে বাধা দেয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে নিজের রুমে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন সানজিদা। এর কিছু সময় পরে সালেহ উদ্দিন দরজার বাইরে থেকে উঁকি মেরে স্ত্রীকে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে শাবল দিয়ে দরজা ভেঙে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থা থেকে নামিয়ে পার্শ্ববর্তী সাফিয়া-সোবহান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে মরদেহ ফিরিয়ে আনা হয়।
সরেজমিনে তদন্তকালে সানজিদার দেড় বছরের শিশু মানহাকে ওই বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তবে মুঠোফোনে কথা বলার সময় স্বামী সালেহ উদ্দিন বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন এবং স্ত্রীকে হারানোর শোক প্রকাশ করছিলেন। মরদেহের শরীরের বিভিন্ন অংশে জমাট রক্তের দাগ ও আঘাতের চিহ্নের বিষয়ে প্রশ্ন করলে সালেহ উদ্দিন জানান, সানজিদাকে কোনো প্রকার শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি।
ঘটনাস্থলে সানজিদার কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে থেকে ভারী কোনো কিছু দিয়ে আঘাত করে দরজা খোলার চিহ্ন রয়েছে। তবে ফ্যানের যে পাখায় আত্মহত্যার জন্য ঝোলার দাবি করা হচ্ছে, সেই পাখাগুলো একেবারেই স্বাভাবিক অবস্থাতেই রয়েছে। কক্ষে একটি সুতি কাপড়ের বড় ওড়না দেখা যায়। ওই পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ওড়নাটি গলায় ফাঁস দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছিলেন সানজিদা। তবে সেটিতে কোনো ধরনের রক্তের চিহ্ন কিংবা দাগ পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসক ও পুলিশের বক্তব্য
সাফিয়া-সোবহান হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় ঘটনার দিনে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. শাহিন মোল্লার সাথে। তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে রোগীকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। প্রথম দুই মিনিট রোগীর এই অবস্থার কারণ সম্পর্কে স্বজনেরা কিছুই জানাননি। পরে বলা হলো রোগী মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। আমি বললাম মাথা ঘুরে পড়ে গেলে তো এমন হওয়ার কথা না। নার্ভ, হার্টবিট, চোখ দেখলাম, কিছুই পেলাম না। সিপিআর দেওয়া শেষে একটি ইসিজি করে দেখলাম রোগী বেঁচে নেই। পরে তাদের বললাম, রোগী তো বেঁচে নেই, এটা কীভাবে হলো? কিন্তু তারা কিছুই বলছিল না। গলায় দাগ (নেক লাইগেচার মার্ক) দেখে পুলিশ কেইস বুঝতে পেরে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে রেফার করি। তবে তারা সেখানে গিয়েছিল কি না, তা আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল বাশার জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ মেঝেতে শোয়ানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিহতের বাবার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন।