
চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহরের একটি আবাসিক ভবনে গ্যাসলাইনের বিস্ফোরণে দগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে নুরজাহান আক্তার রানী নামের ৪০ বছর বয়সী এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই বিস্ফোরণে নুরজাহান আক্তার রানীর শরীরের শতভাগ দগ্ধ হয়েছিল। তার স্বামী ও সন্তানসহ পরিবারের আরও আটজন সদস্য বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দগ্ধদের ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই নুরজাহান আক্তার রানীকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নুরজাহান আক্তার রানীর মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার ভোরে হালিশহরের ওই ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরপরই ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। প্রতিবেশীরা জানান, দুর্ঘটনার পর শরীরে আগুন নিয়েই ওই পরিবারের সবাই একে একে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। সেহরির সময় ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন শিশুসহ মোট ৯ জন দগ্ধ হন।
নিহত নুরজাহান আক্তার রানী ছাড়া দগ্ধ বাকি আটজন হলেন—তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন (৪৬), তাদের দুই সন্তান শাওন (১৭) ও আইমান (১০), সাখাওয়াত হোসেনের পর্তুগালপ্রবাসী ছোট ভাই সুমন (৪০), সুমনের স্ত্রী পাখি (৩৫), তাদের দুই সন্তান আয়েশা (৪) ও আনাছ (৭) এবং সাখাওয়াত হোসেনের আরেক ভাই শিপন (৩২)। দুর্ঘটনার পর তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছিলেন।
চিকিৎসকদের তথ্যমতে, নিহত নুরজাহান আক্তার রানীর পাশাপাশি পাখি ও সাখাওয়াত হোসেনের শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া শিপনের ৮০ শতাংশ, সুমন ও শাওনের ৪৫ শতাংশ, আইমান ও আনাছের ২৫ শতাংশ এবং শিশু আয়েশার শরীরের ২০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
পেশায় গ্যারেজ মালিক সাখাওয়াত হোসেন দেড় বছর আগে ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি স্ত্রী নুরজাহান আক্তার রানী, দুই সন্তান ও গ্যারেজের এক কর্মচারীসহ থাকতেন। কয়েক দিন আগে তার ছোট ভাই সুমন ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে পরিবার নিয়ে ওই বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের (জোন-১) উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে রান্নাঘরে গ্যাস জমে ছিল এবং চুলার আগুন ধরাতে গিয়েই এই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস আরও জানিয়েছে, এই শক্তিশালী বিস্ফোরণে ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজা ও জানালা ভেঙে গেছে।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ওই ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা রয়েছে এবং ওপরের তলাগুলোতে চারটি করে ইউনিট আছে। তৃতীয় তলায় সাখাওয়াত হোসেনের যে ফ্ল্যাটটিতে আগুন ধরে যায়, সেটি ছাড়াও ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্ল্যাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তৃতীয় তলার লিফটের দরজা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলার লিফটের দরজা বাঁকা হয়ে গেছে।
তৃতীয় তলায় সাখাওয়াত হোসেনের মুখোমুখি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন জসীম উদ্দিন। তিনি জানান, সেহরির জন্য ভোরে তারা উঠেছিলেন। আনুমানিক ভোর সাড়ে চারটার দিকে বিকট শব্দে তাদের ঘরের মূল দরজাসহ জানালার কাচ ভেঙে যায়, এমনকি ঘরের সিলিং ফ্যান বাঁকা হয়ে যায় এবং ফ্রিজও উল্টে পড়ে যায় বলে জসীম উদ্দিন উল্লেখ করেন।
পাশের আরেকটি ফ্ল্যাটে থাকেন শামীমা আক্তার তমা, যিনি সেখানে একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন। শামীমা আক্তার তমা জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন এবং হঠাৎ বিকট শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। এরপর তিনি দেখতে পান ঘরের দরজা উড়ে গিয়ে তার পার্লারের আলমারি ও শোকেসের কাচ ভেঙে গেছে।
শামীমা আক্তার তমা আরও জানান, বাসাটি থেকে চিৎকার শুনে তিনি দৌড়ে গিয়ে দেখেন দগ্ধরা ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন এবং তাদের শরীরে তখন আগুন জ্বলছিল। বাসাটির ডাইনিং টেবিলে প্লেটে ভাত দেখা গেছে জানিয়ে শামীমা আক্তার তমা ধারণা করেন, সেহরি খাওয়ার শেষ দিকে হয়তো এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এদিকে ভবনের গ্যাসলাইনে কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল না বলে দাবি করেছেন দিদারুল। দিদারুল জানান, তারা সবসময় গ্যাসলাইন নিয়মিত মেরামত করে রাখেন।
অন্যদিকে ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাট জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতই বিকট ছিল যে মনে হচ্ছিল পুরো ভবন ধসে পড়বে। মো. সম্রাট আরও বলেন, মূল ফটকের পকেট গেট খুলে দিয়ে সেহরি খেয়ে তিনি ঘুমাতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণের পর তিনি দেখতে পান ওপর থেকে ওই ঘরের লোকজন নেমে আসছেন এবং তাদের সবার শরীর আগুনে মারাত্মকভাবে দগ্ধ ছিল।