
সৌদি আরব থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেশে ফেরার ১৩ দিন পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরেছেন রিজিয়া বেগম। মঙ্গলবার উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে তাকে তার তিন সন্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই অনুষ্ঠানে সৌদি আরবে ভয়াবহ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা আরেক নারী রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) তার করুণ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন রিজিয়া বেগম। এভসেক কর্মকর্তা ও বিমানবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার মাহবুব আলম অনুষ্ঠানে জানান, ওই সময় রিজিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অসংলগ্ন ছিল এবং তিনি নিজের কোনো তথ্য জানাতে পারছিলেন না। সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন।
তার কাছে কোনো পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র না থাকায় পরিবার খুঁজে পেতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) খুলনা অঞ্চলের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ঢাকায় পিবিআই সদস্যরা তার আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হন যে, তার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে। এরপর ব্র্যাক সেখানে গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজে বের করে।
রিজিয়ার মেয়ে লিজা আক্তার জানান, ২০১৯ সালে গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার এটিবি ওভারসিজ লিমিটেডের সহায়তায় তার মা সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়োগকর্তার নির্যাতনের শিকার হন। ২০২১ সালের পর থেকে মায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লিজা জানান, নির্যাতনের কারণে তার মায়ের চেহারা এতটাই বদলে গেছে যে তাকে এখন চেনাই কঠিন, আর তিনি কোনো কথাও বলছেন না।
অনুষ্ঠানে রিমা আক্তার নামে সৌদিফেরত আরেক নারী তার ওপর চলা নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তিনি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। কিন্তু সেখানে তাকে চারবার বিক্রি করা হয় এবং তিনি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বিচারের বদলে গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ তাকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে।
অনুষ্ঠানে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীদের পরিচয় শনাক্তকরণে পিবিআই এই প্রথম কাজ করল। ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতিতে পিবিআই ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সহকারী পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ভুঞা এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, রিমা বা রিজিয়ার মতো নারীদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই। মানসিক ভারসাম্যহীন বা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হলেও দোষীদের কোনো বিচার হয় না। এমন বিদেশফেরত মানুষের সহায়তায় বিমানবন্দরে রাষ্ট্র ও সবার সম্মিলিত উদ্যোগে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।