সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি: নেতাদের দাবি ‘বন্ধ’, তবু প্রতিদিন উঠছে কোটি টাকা

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ৩:২৪ অপরাহ্ন


দেশের পরিবহন খাতে শ্রমিক সংগঠনের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা গেলেও মালিক সংগঠনের সঠিক হিসাব পাওয়া বেশ কঠিন। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিকদের মোট ৯৩২টি সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের আয়ের প্রধান উৎস পরিবহন থেকে তোলা চাঁদা।

সংগঠনগুলোর দাবি, এই টাকা পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সংগঠন পরিচালনায় ব্যয় হয়। তবে খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, আদায়কৃত বিশাল অংকের চাঁদার তুলনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য।

মালিক-শ্রমিক সংগঠন ছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন গবেষণা ও তদন্তে উঠে এসেছে।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, কেবল রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এর বড় অংশই যায় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতির নামে। এছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকেই বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়।

দেশের সড়ক পরিবহন শ্রমিক খাতের প্রায় সব সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের আওতাভুক্ত। একসময় আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান খান এই সংগঠনে একক কর্তৃত্ব ধরে রাখলেও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ গেছে বিএনপিপন্থী নেতাদের হাতে।

সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স জানান, ইউনিয়ন পরিচালনার জন্য ৩০ টাকা এবং ফেডারেশনের জন্য ১০ টাকা চাঁদা নির্ধারিত। তবে ট্রাক থেকে গত পাঁচ বছর ধরে এবং ফেডারেশনের জন্য দেড় বছর ধরে চাঁদা তোলা বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ভর্তুকি দিয়ে সংগঠন চলছে। মূল চাঁদাবাজি মালিক সমিতির নামে হচ্ছে এমন দাবি করে আব্দুর রহিম বক্স বলেন, খুলনা থেকে কুষ্টিয়াগামী একটি রুটে মালিক সমিতি যাতায়াতে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে নেয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির শীর্ষ পদে একসময় ছিলেন খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। এখন সেই নেতৃত্বে এসেছেন বিএনপিপন্থী পরিবহন মালিক সাইফুল আলম।

চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে সাইফুল আলম জানান, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, স্টাফদের বেতন এবং কোম্পানির পরিচালন ব্যয়ের জন্যই মূলত টাকা তোলা হয়। এটিকে চাঁদাবাজি বলতে নারাজ তিনি।

তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মালিক সমিতির নামে সব ধরনের চাঁদা আদায় বন্ধ রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সমিতির জন্য চাঁদার একটি নির্দিষ্ট হার তারা ঠিক করে দিতে চান।

বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ জানান, তাদের সংগঠন কোনো পরিবহন থেকে চাঁদা তোলে না। সড়কে মূলত চাঁদা তুলছে ভুঁইফোঁড় কিছু অবৈধ সংগঠন।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে পরিবহন খাতে ব্যাপক প্রভাব ছিল সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, পরিবহন মালিক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ ও জাতীয় পার্টির নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা প্রমুখের। বর্তমানে এই খাতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

চাঁদাবাজির বিষয়ে শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা অবৈধ চাঁদাবাজি, যা সাধারণ মালিক-শ্রমিকরা করেন না, বরং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা করে থাকেন।

বাংলাদেশের পরিবহন খাতকে আরও জনবান্ধব করার তাগিদ দিয়ে শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আরও বলেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চাঁদা তোলা বন্ধ রাখা হয়েছে। এর বাইরে এখন যা হচ্ছে, তা তার নজরের বাইরে এবং তিনি এগুলোর ঘোর বিরোধী।