সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ফেসবুকে অনুমোদনহীন ওষুধের ছড়াছড়ি, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ক্রেতারা

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১ মার্চ ২০২৬ | ৩:৫৬ অপরাহ্ন


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে দেদার বিক্রি হচ্ছে ক্ষতিকর ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট ও কসমেটিকস পণ্য। ভেষজ, হারবাল, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, অ্যাগ্রোভেট ও অর্গানিকসহ বিভিন্ন নামে বিক্রি হওয়া এসব চিকিৎসাপণ্য তৈরিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। বিপণনের ক্ষেত্রেও নেই কোনো অনুমোদন। উৎপাদক ও বিক্রেতারা চিকিৎসক না হয়েও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসে সপ্তাহ থেকে মাসের মধ্যে বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগ থেকে সুস্থতার আশ্বাস দিচ্ছেন।

শতভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ও বিফলে মূল্য ফেরতের ঘোষণাসহ চটকদার বিজ্ঞাপনে রোগীদের আকৃষ্ট করে তারা অনলাইনে ভুয়া চিকিৎসার ফাঁদে ফেলছেন। আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্রটোকল না মেনে তৈরি এসব পণ্য সেবনকারীরা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)-সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নাকের ডগায় এসব ক্ষতিকর পণ্য বিক্রি হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সম্প্রতি একাধিক ফেসবুক পেজ অনুসরণ করে ভেষজ ওষুধসহ অনুমোদনহীন চিকিৎসাপণ্য বিক্রির সত্যতা মিলেছে। এসব পেজে একেকজন বিশেষজ্ঞ সেজে পরামর্শ দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে পণ্যগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করছেন। এগুলো সেবন করে রোগীরা এক রোগ সারাতে গিয়ে আরও নতুন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট ও কসমেটিকস বাজারজাত করার আগে মানবদেহে এর কার্যকারিতা ও ব্যবহারের মাত্রা বিষয়ে গবেষণা জরুরি। মানবদেহে প্রয়োগের আগে প্রাণীদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দিতে হয়। ওষুধ প্রস্তুতকারক ও গবেষকদের চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ে বৈধ সনদ থাকতে হবে এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের চিকিৎসাসামগ্রী বাজারজাত করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ২৮৯টি ইউনানি, ২০৬টি আয়ুর্বেদিক, ৭১টি হোমিওপ্যাথিক, ৪৪টি ভেষজ ও ৩২৫টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কোম্পানি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ৫১ হাজারের বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করছে, যা দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ওষুধের বর্তমান বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো।

ওষুধ উৎপাদনসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ওষুধের বাজারের বড় একটি অংশ ভেষজ ওষুধের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরির নামে কোনো ধরনের ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ঘরোয়াভাবে এসব তৈরি করছে। অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় বিভিন্ন উপাদান মেশানো হচ্ছে এবং সংরক্ষণের জন্য সঠিক তাপমাত্রা বা কোল্ড চেইন পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও নিজেদের ইচ্ছামতো লেখা হচ্ছে।

অসাধু ব্যবসায়ীরা হাঁপানির ওষুধে উচ্চমাত্রায় স্টেরয়েড, মোটা হওয়ার ওষুধে পেরিয়েক্টিন, যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওষুধে সিল্ডেনাফিল সাইট্রেট, ত্বক ফর্সা করার ক্রিমে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড এবং দাঁত পরিষ্কারের ওষুধে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ব্যবহার করছে। এসব উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগে জীবন বিপন্ন হতে পারে। গরু মোটাতাজা করার উপাদান পেরিয়েক্টিন মানুষের কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় এসব পণ্য বিক্রির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুকে এ ধরনের কয়েক হাজার পেজ রয়েছে। ‘তাহারাত শপ’ নামে একটি পেজ দাউদ, একজিমা, সোরিয়াসিস ও ফাঙ্গাল ইনফেকশনের চিকিৎসায় ‘এলার্জি কিলার’ বড়ি বিক্রি করছে। একইভাবে ‘এলার্জি কিউর বিডি’ ও ‘আওয়া ইন্টারন্যাশনাল হার্ব’ পেজে অ্যালার্জির পাউডার, ‘রুজাইনা বেবি কেয়ার’ পেজে শিশুদের ত্বকের সমস্যার জন্য বিদেশি মোড়কে ক্রিম বিক্রি করা হচ্ছে। ‘পুরোটাই পিউর’ পেজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের ভুয়া রেফারেন্স দিয়ে বিটরুট পাউডার বিক্রি করা হচ্ছে, যা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় বলে দাবি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ‘ভিটা গ্যালারি’, ‘অ্যাজমা রিলিফ’, ‘অর্গানিক দেশি ফুড’, ‘ডেইলি হেলথ’, ‘তাখফিফুল শিফা’, ‘খাজা বনাজি’, ‘ফিরনাস’, ‘অ্যালব্রাটোস বিডি’, ‘সাইফুল হেলথি ফুড বিডি’ ও ‘ভেষজ হেলথ কেয়ার’-সহ অসংখ্য পেজে বিভিন্ন জটিল রোগের চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যালস কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, অনুমোদন ছাড়া ওষুধ তৈরি বা বাজারজাত করা বেআইনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জিএমপি গাইডলাইন অনুযায়ী ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করতে হয়। ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩’ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া ইন্টারনেট মিডিয়ায় ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার জন্য জরিমানা ও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো উচিত।

বাংলাদেশ ইউনানি অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বুয়ামা) সভাপতি ডা. তাওহিদ আল বেরুনী জানান, ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে আলাদা লাইসেন্স নিতে হয়। যত্রতত্র তৈরি পণ্যকে কোনোভাবেই ‘মেডিসিন’ বলা যাবে না। এগুলোকে বড়জোর ফুড সাপ্লিমেন্ট বলা যেতে পারে।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, অনলাইনে ওষুধ বিক্রি বন্ধে কার্যকর কার্যক্রম নেই। তবে সশরীরে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা হচ্ছে। ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩’-এর বিধি প্রণয়ন হয়েছে এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিধিটি কার্যকর হলে সব মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা সহজ হবে। প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, ওষুধ নকল বা ভেজাল হলে এর প্রথম ভুক্তভোগী রোগী। বড় কোম্পানিগুলো সঠিক নিয়ম মেনে ওষুধ বানালেও ভুঁইফোঁড়দের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নতুন ওষুধ আইন অনুযায়ী বিধি প্রণীত হলে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি বা ভুঁইফোঁড় কেউই ফেসবুকে ক্যাম্পেইন করে ওষুধ বিক্রি করতে পারবে না।