
নারী-পুরুষের চিরায়ত ভেদাভেদ ভেঙে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন ফরিদা ইয়াসমিন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম জেলার একমাত্র নারী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে মিরসরাই থানায় অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে একুশে পত্রিকার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তাঁর জীবনের সংগ্রাম, সাফল্য ও হার না মানা প্রত্যয়ের গল্প।
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মিরসরাই থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন ফরিদা ইয়াসমিন। তাঁর যোগদানের পর থেকেই এই থানা এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক কারবার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। এর আগে তিনি কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও থানায় ওসি হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফরিদা ইয়াসমিনের জন্ম ফরিদপুর জেলায়। তাঁর স্বামী মো. মোহাম্মদ মজিবুর রহমানও একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) কর্মরত আছেন। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
২০০৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন ফরিদা ইয়াসমিন। সারদা পুলিশ একাডেমিতে এক বছরের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে আইন বিষয়ে শ্রেষ্ঠ মহিলা ক্যাডেট হিসেবে পদক অর্জন করেন তিনি। ২০০৪ সালে প্রশিক্ষণ শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) যোগদানের মাধ্যমে তাঁর মূল কর্মজীবন শুরু হয়। এরপর তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), বরিশাল রেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের বিভিন্ন ইউনিটে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২২ ও ২০২৫ সালে দুই দফায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি এবং মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে পদক অর্জন করেছেন এই অদম্য নারী কর্মকর্তা।
একুশে পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওসি ফরিদা ইয়াসমিন জানান, মিরসরাই থানায় আসার আগে কক্সবাজারের ঈদগাঁও থানায় ওসি হিসেবে কাজ করার সময় তাঁকে বিভিন্ন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেখানে ডাকাতি ও অপহরণের মতো অপরাধ দমন করা তাঁর জন্য বড় একটি পরীক্ষা ছিল। পাহাড়িরা প্রতিনিয়ত অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ধরতে সক্ষম হন। তাঁর এই সাহসিকতাপূর্ণ অভিযানের পর সেখানে আর কোনো অপহরণের ঘটনা ঘটেনি।
নারী হিসেবে কোনো প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি ফরিদা ইয়াসমিন দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, একজন নারী ওসি হিসেবে তিনি দেখিয়ে দিতে চান যে পুরুষের চাইতে নারী কোনো অংশে কম নয়। নারী পুলিশ অফিসার হয়েও তিনি কখনো বসে থাকেননি। একজন পুরুষ অফিসার যেভাবে কাজ করেন, তিনিও মাঠে নেমে ঠিক সেভাবেই কাজ করেছেন। তিনি মনে করেন, নিজেকে নারী ভেবে বসে থাকলে নিজেই বৈষম্যের শিকার হতে হবে এবং এই বৈষম্য নিজেকেই ঘোচাতে হবে। তাই অন্যান্য পুরুষ অফিসারের মতো তাঁকেও মানুষের জানমাল রক্ষায় দিনরাত কাজ করতে হয়। পুলিশ বাহিনীতে কাজ করলে চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে এবং সেই চ্যালেঞ্জ জেনেই তিনি এই বাহিনীতে যোগদান করেছেন। তাঁর এই পথচলা দেখে অন্যান্য নারীরাও এই পেশায় আসতে অনুপ্রেরণা পাবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে ওসি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নারীদের যদি নিজস্ব কর্মসংস্থান থাকে, তবে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা লাভ করেন এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তবে নারীদের কাজ করার ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। দেশের অনেক নারী আজ তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিশাল অবদান রাখছেন এবং নারী উদ্যোক্তাদের কারণে ক্ষুদ্র শিল্প অনেক দূর এগিয়েছে।
পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের পর কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হননি জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ বিভাগে অনেক সাহসী নারী রয়েছেন, যাঁরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। সারাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন নারী ওসি থাকলেও যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করার। পুলিশের চাকরিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি হয়। অনেক নারী আইনি সহায়তার জন্য একজন নারী অফিসারের কাছে নিজের ভেতরের কথাগুলো যতটা সহজে বলতে পারেন, পুরুষ অফিসারের কাছে ততটা পারেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এই জায়গাটিতে নারী পুলিশ কর্মকর্তারা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
কর্মজীবী নারী হিসেবে পারিবারিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ফরিদা ইয়াসমিন জানান, তিনি এবং তাঁর স্বামী মো. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় পরিবারের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা থাকে। এটি তাঁদের পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়। চাকরির সুবাদে পরিবার বা সন্তানদের অনেক সময় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না, যা মেনে নিয়েই তাঁদের এগিয়ে যেতে হয়।
নেতৃত্বের বিষয়ে ফরিদা ইয়াসমিন জানান, তিনি নারী হলেও সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন এবং সহকর্মীরাও তাঁকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেছেন। তিনি সহকর্মীদের কাজের স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং নিজেও মাঠে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন। এখানে নারী-পুরুষ বলে কোনো কথা নেই, এটি আসলে নেতৃত্বের গুণাবলি। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত মাঠে থাকেন, কাজের তদারকি করেন এবং সদস্যদের ভালোমন্দ শোনেন। একজন পুরুষ অফিসারকে সহকর্মীরা যেভাবে মেনে চলেন, তাঁকেও ঠিক সেভাবেই তাঁরা গ্রহণ করেছেন।