সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

রামগড়ে অবৈধ করাতকলে উজাড় পাহাড়ি বন, হুমকিতে পরিবেশ

রামগড় (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি | প্রকাশিতঃ ৮ মার্চ ২০২৬ | ৯:০২ অপরাহ্ন


খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় অবৈধ করাতকলের দৌরাত্ম্যে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ি বনাঞ্চল। দিনরাত চলা এসব করাতকলে কাটা হচ্ছে বনের কচি-কাঁচা গাছ। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামগড়ে ১৯টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই সরকারি অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। এসব করাতকল মূল সড়কের পাশে এবং বনাঞ্চলের সীমানা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। পাহাড়ি এলাকা থেকে কাঠ এনে সেখানে চেরাই করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য অঞ্চলে সংরক্ষিত বন, রক্ষিত বন, ব্যক্তিমালিকানাধীন বন ও অশ্রেণিভুক্ত বন—এই চার ধরনের বন রয়েছে। তবে অধিকাংশ বনই অশ্রেণিভুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে এসব বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে বন উজাড়ের প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় থেকে কাঠ কেটে ট্রাকে করে এনে এসব করাতকলে চেরাই করা হয়। পরে রাতের আঁধারে সেসব কাঠ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে প্রাকৃতিক বন বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। তবে সেই নিয়ম উপেক্ষা করেই বনাঞ্চল ঘিরে একের পর এক করাতকল গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। করাতকলের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি করাতকলে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ ঘনফুট কাঠ চেরাই করা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামগড় বাজার, তৈছালা পাড়া, নজিরটিলা, পাতাছড়া, নাকাপা, সোনাইপুল, বলিপাড়া, খাগড়াবিল ও কালাডেবা এলাকায় একাধিক করাতকল গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব করাতকলের বেশির ভাগই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কালাডেবা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রেজাউলসহ কয়েকজন জানান, অবৈধ করাতকল বন্ধে বন বিভাগ বা প্রশাসনের তেমন কোনো অভিযান চোখে পড়েনি। ফলে মালিকেরা প্রকাশ্যেই বনাঞ্চলের গাছ কেটে করাতকলে চেরাই করছেন।

খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের নেতা আবু দাউদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে বন ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পাহাড়ি এলাকায় গাছ কাটার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ না আনলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

রামগড় করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. কবির মিয়া উপজেলার অধিকাংশ করাতকলের লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে কাগজপত্র ঠিক করতে অনেক মালিক ইতিমধ্যে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও মো. কবির মিয়া জানান।

খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিয়া জানান, জেলায় বর্তমানে ১০৫টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছেন। লাইসেন্সবিহীন বা অবৈধ করাতকলের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।

রামগড় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, অবৈধ করাতকলগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং অনেক মালিক লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছেন। বনের কাঠ পোড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে খলিলুর রহমান উল্লেখ করেন।

রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীম জানান, সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে। খুব শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং অবৈধ করাতকল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কাজী শামীম আশ্বাস দেন।