
আসছে গ্রীষ্মের শুরুতে, বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা ধরনের পরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার।
তবে জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু এলএনজি আমদানিতে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সেই বিপুল চাহিদা পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বা লোড ম্যানেজমেন্ট করার পরিকল্পনা করেছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ বাস্তবেই বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে যাচ্ছে।
মার্চ মাসে সংকট তেমন প্রকট না হলেও এপ্রিল ও মে মাস নিয়ে বেশ উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এ সময়ে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় অর্ধেক কেন্দ্র সারা বছরই বন্ধ থাকে।
বাকি কেন্দ্রগুলোও গ্যাসের স্বল্পতার কারণে নিয়মিত চালানো কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিপিডিবি সূত্র জানায়, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মার্চ ও এপ্রিল মাসে গড়ে ৮০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে—এমন একটি পরিকল্পনা ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহের কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তবে এ জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যদি গ্যাস সরবরাহ এর চেয়ে কমে যায়, তাহলে লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি হতে পারে।
বিপিডিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এলএনজি আমদানি। সরকার স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা করছে।
তবে নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজি আমদানিতে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করতে হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে বিপিডিবির বিপুল আর্থিক দায়ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আসন্ন গ্রীষ্মে, বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে লোডশেডিং এড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
তবে এসব কেন্দ্রের কাছে সরকারের বকেয়া রয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে কয়লা আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি খাতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় সরকার মূলত দিনের বেলায় এসব কেন্দ্র চালানোর পরিকল্পনা করছে।
এ ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের কাছে সরকারের বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। তেলের সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এসব কেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
সরকারের পরিকল্পনায় ভারতের আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ভারত থেকে ২ হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রাখার কথাও রয়েছে।
পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা, বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং তেলবাহী জাহাজে আক্রমণের ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও।
ইতোমধ্যে দেশের জন্য নির্ধারিত কিছু এলএনজি কার্গো সময়মতো আসতে পারছে না এবং জ্বালানি তেলের কয়েকটি জাহাজও বিলম্বিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে এলপিজি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের জ্বালানি খাত বহুমুখী চাপের মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে এলএনজি না এলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাবে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাস্তবিক কারণে লোডশেডিং মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না।
দায়িত্বশীলরা বলছেন, গ্যাসের সংকট থাকলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর চেষ্টা করা হবে। তবে সেখানেও রয়েছে পর্যাপ্ত জ্বালানি জোগানের চরম অনিশ্চয়তা।
সার্বিক বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে আপাতত কোনো তাৎক্ষণিক সমস্যা নেই।
তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয় বলে পরিস্থিতি জটিল হলে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন মো. সাইফুল ইসলাম।
মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, চলতি মাসে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কারণ এ মাসের চালান ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী মাসে সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক চাপও বাড়তে পারে বলে মো. সাইফুল ইসলাম সতর্ক করেন।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং এ জন্য পেট্রোবাংলার কাছে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চাওয়া হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে গড়ে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি কার্গো বিলম্বিত হওয়ায় তা কমে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যাবে—এ প্রশ্নের জবাবে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকৌশলী রেজাউল করিম আরও বলেন, ইতোমধ্যে বেশির ভাগ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু রয়েছে এবং কেবল নরিনকোর একটি কেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ আছে।
কয়লা আমদানি অব্যাহত রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও প্রকৌশলী রেজাউল করিম নিশ্চিত করেন।