
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলেও অবসরের টাকা পেতে পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এমনিতেই এসব শিক্ষকের বেতন কম এবং কোনো পেনশন সুবিধা নেই, ফলে শেষ জীবনে অবসরের এককালীন টাকাই তাঁদের একমাত্র ভরসার জায়গা।
কিন্তু আবেদনের চার বছর পরও অবসরের টাকা পাচ্ছেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা। এমনকি এই টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় অনেক শিক্ষক রোগ-শোকে ভুগে মারাও যাচ্ছেন।
দীর্ঘদিন ধরে এমন করুণ অবস্থা চললেও আগের সরকার এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। সম্প্রতি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় শিক্ষকরা আশা করছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক থাকায় তাঁদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সরকার বিশেষ নজর দেবে।
এই খাতে প্রয়োজনে আগামী বাজেটেই বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং ভবিষ্যতেও যেন সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দের জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের জন্য রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট।
শিক্ষকদের প্রতি মাসের মূল বেতন থেকে অবসর বোর্ডে ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ ট্রাস্টে ৪ শতাংশ টাকা কেটে নেওয়া হয়।
তবে বেতন থেকে কেটে নেওয়া এই অর্থে পেনশনের পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর বাজেটে চাহিদামতো এককালীন থোক বরাদ্দ না দেওয়ায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদনের বিশাল স্তূপ জমে আছে।
এর মধ্যে অবসর বোর্ডে প্রায় ৬৫ হাজার এবং কল্যাণ ট্রাস্টে প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে।
একটি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল হাই আক্ষেপ করে জানান, তিন বছর আগে অবসরে গেলেও এখনো টাকা পাননি। ছেলেমেয়েরাও সেভাবে সচ্ছল নয় এবং নানা রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে।
আবদুল হাই আরও বলেন, মনে করেছিলেন অবসরের পুরো টাকাটা পেলে একটু ভালো করে চিকিৎসা করাবেন এবং ছেলের একটি কাজের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু কবে টাকা পাবেন, তা কেউ বলতে পারছে না।
প্রয়োজনের সময় টাকা না পেলে পরে পেয়ে কী লাভ, শিক্ষকদের দুঃখ কেউ বোঝে না বলে আবদুল হাই হতাশ কণ্ঠে মন্তব্য করেন।
অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৬ শতাংশ অর্থে প্রতি মাসে জমা হয় ৭০ কোটি টাকা এবং বোর্ডের এফডিআর থেকে আসে তিন কোটি টাকা।
প্রতি মাসে মোট আয় ৭৩ কোটি টাকা হলেও পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে প্রয়োজন হয় ১১৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ৪২ কোটি টাকা।
এভাবে আবেদন জমতে জমতে চার বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যার ফলে একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার চার বছরেরও বেশি সময় পর টাকা পাচ্ছেন।
কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন থেকে পাওয়া ৪ শতাংশ অর্থ ফান্ডে প্রতি মাসে জমা হয় ৫০ কোটি টাকা এবং ট্রাস্টের এফডিআর থেকে মাসে পাওয়া যায় দুই কোটি টাকা।
প্রতি মাসে আয় ৫২ কোটি টাকা হলেও আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৬৫ কোটি টাকা। এতে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যায় ১৩ কোটি টাকা।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ জানান, শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রতা দীর্ঘদিনের।
অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ আরও বলেন, শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে যে অর্থ পাওয়া যায় এবং যে টাকা তাঁদের দিতে হয়, এর মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকার ফলেই দীর্ঘ জটের সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষকদের আবেদনের তথ্যেও অনেক গরমিল থাকে, যার কারণে অনেকের টাকা পেতে দেরি হয় বলে অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ উল্লেখ করেন।
অবসরের টাকা সঙ্গে সঙ্গে দিতে হলে সরকারকে এ খাতে এককালীন বরাদ্দের পাশাপাশি প্রতিবছরের বাজেটেই বরাদ্দ রাখতে হবে বলে অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ জানান। তিনি নিশ্চিত করেন, মন্ত্রণালয়কে এসব বিষয় অবহিত করা হয়েছে এবং তারা সামর্থ্য অনুযায়ী উদ্যোগ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে পৃথকভাবে পেনশনের টাকা পরিশোধ করা হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে যারা আবেদন করেছিলেন, তারা এখন অবসর বোর্ডের টাকা পেয়েছেন। আর ২০২২ সালের নভেম্বরে যারা কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করেছিলেন, তারা এখন টাকা পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব শিক্ষকের পাওনা একবারে পরিশোধ করতে সরকারের কাছ থেকে এককালীন সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ এবং প্রতিবছরে বাজেটে মাত্র ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।
কিন্তু অবহেলিত এসব শিক্ষকের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে আগের সরকারের তেমন আগ্রহ ছিল না।
জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অফিস পলাশীর ব্যানবেইস ভবন থেকে ইস্কাটনের প্রবাসী কল্যাণ ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। শিক্ষকরা আশা করছেন, অফিস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাওনা টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও গতি ফিরবে।
শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব মো. জাকির হোসেন জানান, দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
তাঁরা অবসরের টাকা পেতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন উল্লেখ করে মো. জাকির হোসেন আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন সরকার খুব দ্রুত শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে।
মো. জাকির হোসেন আরও বলেন, বেসরকারি শিক্ষকদের সমস্যা বেসরকারি শিক্ষকরাই বেশি বুঝবেন। অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল।
অথচ অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে এগুলো পরিচালনার দায়িত্ব বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের হাতে দিয়ে গেছে, যা বেসরকারি শিক্ষক সমাজ মেনে নেবে না বলে মো. জাকির হোসেন হুঁশিয়ারি দেন।
এই অধ্যাদেশ বাতিল করে দুই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পুনরায় বেসরকারি শিক্ষকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান মো. জাকির হোসেন, অন্যথায় বেসরকারি শিক্ষক সমাজ আবারও আন্দোলনে নামবে বলে তিনি সতর্ক করেন।