
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় শবে কদরের নামাজ শেষে গভীর রাতে একটি বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মসজিদের মাইকে ঘোষণা ও ফেসবুকে বার্তার মাধ্যমে এলাকার লোকজন জড়ো হয়ে ধাওয়া করে ডাকাত দলের সদস্যদের ধরে গণপিটুনি দেয়।
পরে পুলিশ ও জনতার যৌথ অভিযানে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাতে উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের বদুপাড়া এলাকার হাজী মুহাম্মদ ইউসুফের বাড়ি ‘ইউসুফ মঞ্জিল’-এ এই ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাজী মুহাম্মদ ইউসুফের পরিবারের সদস্য ও তাঁর সন্তানরা ওই বাড়িতে একসঙ্গে বসবাস করেন। শবে কদরের নামাজ আদায় শেষে রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। বাড়ির তিন তলার সিঁড়ির পাশে থাকা একটি ছোট ফটক দিয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করে এবং নিচে নেমে মূল দরজা খুলে দেয়।
এতে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল ঘরে প্রবেশ করে পরিবারের সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একটি কক্ষে আটকে রাখে এবং মারধর শুরু করে। পরে ডাকাতরা আলমারিসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভেঙে নগদ আড়াই লাখ টাকা, ২৩ ভরি সোনার গহনা এবং ঈদের নতুন কাপড় লুট করে নিয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজন জানান, শবে কদরের নামাজ শেষে তাঁরা মসজিদে ছিলেন। এ সময় হাজী মুহাম্মদ ইউসুফের নাতি জোবায়েদ আজম মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে অপরিচিত কিছু লোককে তাঁদের বাড়ির সামনে দেখতে পান। তিনি দৌড়ে মসজিদের মুসল্লিদের ডাকতে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডাকাতরা তাঁকে ধরে ব্যাপক মারধর করে।
একপর্যায়ে জোবায়েদ আজম কোনো রকমে পালিয়ে গিয়ে মসজিদের মুসল্লিদের খবর দেন। এতে সবাই ছুটে এলে ততক্ষণে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। পরে এলাকার বিভিন্ন মসজিদে মাইকিং করে এবং ফেসবুক গ্রুপে মেসেজ দিয়ে ডাকাতির বিষয়টি জানানো হলে এলাকার লোকজন জড়ো হন।
বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে গহনাসহ এক ডাকাতকে রাতেই আটক করে জনতা। এ সময় টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং জনতার সহযোগিতায় সকাল পর্যন্ত খৈয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও সাতজনকে আটক করে। পরে মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকা থেকে আরও দুজনকে আটক করা হয়। আটককৃতরা বেশির ভাগই সিলেটের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা বলে পুলিশের তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ডাকাতির ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে প্রবাসী নজরুল ইসলামের স্ত্রী সাবিনা আকতার জানান, শবে কদরের নামাজ আদায় করে রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন। রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ দরজায় আঘাতের শব্দ শুনে বিছানা থেকে উঠে গলিতে আসতেই ডাকাতরা ছুরি ও বঁটি দিয়ে তাঁর গলায় পোঁচ দেওয়ার ভয় দেখায় এবং চুপ থাকতে বলে ঘরে যা আছে তা দিয়ে দিতে বলে। ডাকাতরা সাবিনা আকতারের নাকফুল খুলে নেয় এবং পরিবারের সবাইকে এক রুমের ভেতর বেঁধে আটকে রাখে।
এ সময় পরিবারের কয়েকজনকে মারধর শুরু করলে সাবিনা আকতার মেয়েদের ও শিশুদের আঘাত না করার আকুতি জানান, তারপরও ডাকাতরা তাঁদের আঘাত করে। তাঁর দেড় ভরি সোনা ও নগদ ৭০ হাজার টাকাসহ পুরো পরিবারের অন্তত ২৩ ভরি সোনা এবং নগদ আড়াই লাখ টাকা ডাকাতরা লুট করে নিয়ে যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সার্বিক বিষয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় জড়িত মোট ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃত প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে ডাকাতি, ডাকাতির প্রস্তুতি ও চুরিসহ সর্বোচ্চ ১২টি থেকে ৪-৫টি করে পূর্বের মামলা রয়েছে। ধৃতদের বাড়ি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায়।
লুণ্ঠিত মালামালের বিষয়ে ওসি সাজেদুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগীরা সোনা লুটের কথা বললেও পুলিশ নগদ ৫ হাজার টাকাসহ তিন জোড়া সিটি গোল্ডের চুড়ি, একটি নেকলেস এবং এক জোড়া কানের দুল উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় জড়িত চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।