
বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা কাটছে না। জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) আওতায় দুটি প্রতিষ্ঠানের ক্রয় প্রস্তাব গত ১২ মার্চ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হলেও এখন পর্যন্ত ওই দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সরকারকে কোনো পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বা পিজি (জামানত) দিতে পারেনি। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সরকারি ক্রয়ের অন্যতম শর্ত এই পিজি না পাওয়ায় তাদের অনুকূলে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে পারছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
ওই দুই কোম্পানির একটি হলো এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এমএফ কামাল বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, পিজি দেওয়ার জন্য এ অ্যান্ড এ এনার্জির প্রিন্সিপালকে বলা হয়েছে। ব্যাংক বন্ধ থাকার কারণে পিজি দেওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। আশা করা হচ্ছে ২৫ মার্চের মধ্যে এটি জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, সরাসরি ক্রয়ের আওতায় আরও তিন কোম্পানি—যুক্তরাষ্ট্রের বেরিনজিয়া, ম্যাক্সওয়েল এবং সুরপাস্টার গ্রুপের প্রস্তাব বিবেচনা করতে কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি। এ কারণে ছুটির দিনেও জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম এবং বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বৈঠক করেছেন।
আগের দুই কোম্পানি টাকা জমা দিতে না পারার পরও অন্য কোম্পানির প্রস্তাব কীভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আগের দুই কোম্পানি যেহেতু এখনো পিজি দেয়নি, তাই নতুন প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রস্তাব দিলেই যে তা গ্রহণ করা হবে এমন নয়; সরকারি সব নিয়ম প্রতিপালন না করলে কোনো লাভ হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
বিপিসি জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত মোটামুটি সন্তোষজনক রয়েছে। ঈদের আগে গত বছরের সঙ্গে তুলনা করে পেট্রোলপাম্পগুলোকে তেল দেওয়া হচ্ছে। আগামী ২৬ ও ২৭ মার্চ ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়বে। এরপর ২৭ মার্চের পর ৬০ হাজার টন ডিজেল দিতে এ অ্যান্ড এ এনার্জি এবং পেট্রোগ্যাস লিমিটেডকে অনুরোধ করা হলেও তারা এখনো তেল দিতে রাজি হয়নি বা পিজি জমা দিতে পারেনি। চুক্তি অনুযায়ী, এ অ্যান্ড এ এনার্জির ৭৫ কোটি এবং পেট্রোগ্যাসের ১২০ কোটি টাকার বেশি পিজি বিপিসির কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা।
জানা গেছে, গত ১২ মার্চ ইফতারের পর অনলাইনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে এ অ্যান্ড এ এনার্জির ১ লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন এবং পেট্রোগ্যাসের ২ লাখ টন ডিজেল আনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অনুমোদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপিসি থেকে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান দুটিকে ‘নো অবজেকশন’ পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর থেকে তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
এ অ্যান্ড এ এনার্জি কোনো জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ ছাড়াই প্রতি ব্যারেল তেল মাত্র ৭৫ ডলারে সরকারকে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে প্ল্যাটস অনুযায়ী বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন প্রায় ১৮০ ডলার। এত কম দামে কীভাবে তেল দেওয়া সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে এমএফ কামাল বলেন, এগুলো তাদের আগের কেনা তেল। কোন দেশ থেকে এই তেল দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। অন্যদিকে, পেট্রোগ্যাস প্ল্যাটসের নির্ধারিত মূল্যের ফর্মুলা এবং প্রতি ব্যারেল ৪ দশমিক ৭২ ডলার ফ্রেইট চার্জে বিক্রির প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে বিপিসি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তেল কিনতে প্রায় ৫ ডলার ফ্রেইট চার্জ দিচ্ছে।
সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আওতায় তেল কেনার খবর পেয়ে ১৫টির বেশি নতুন প্রস্তাব জমা পড়েছে, যা যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে সরকারের সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে সাড়ে ৫ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়, যার বেশির ভাগই ডিজেল। মার্চ মাসে ১৭টি পার্সেল বা জাহাজ আসার কথা থাকলেও ১০টির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এপ্রিলে ১৫টি এলসি খোলা হলেও ১৩টি পার্সেল দেওয়ার সম্মতির বিপরীতে নিশ্চিত হওয়া গেছে মাত্র ৩টির বিষয়ে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর সারা বিশ্বে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে এই দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।