সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

উৎসবের রঙে রঙিন চট্টগ্রাম: ঈদগাহে ঈদগাহে সম্প্রীতির অনন্য দৃশ্য

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ মার্চ ২০২৬ | ১০:১৭ পূর্বাহ্ন


ভোরের আলো ফুটতেই চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস যেন এক স্বর্গীয় শান্তিতে ভরে উঠল। আজ শনিবারের সকালটা অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে আলাদা। বাতাসে ভাসছে আতরের সুবাস, আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। নতুন পোশাক পরে ছোট-বড় সব বয়সের মানুষ পাড়ি জমাচ্ছেন ঈদগাহ ও মসজিদগুলোর দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় এবং দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর পরম করুণাময়ের দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন। নামাজ শেষে একে অপরকে বুকে টেনে নিয়ে কোলাকুলি আর হাসিমুখে ঈদ মোবারক বলার দৃশ্যগুলো যেন চট্টগ্রামের চিরায়ত ভ্রাতৃত্ববোধেরই এক জীবন্ত ক্যানভাস।

নগরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ আজ রূপ নিয়েছিল এক বিশাল মিলনমেলায়। সকাল আটটায় এখানে ঈদের প্রথম ও প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়, আর পৌনে নয়টায় হয় দ্বিতীয় জামাত। প্রথম জামাতে ইমামতির দায়িত্বে ছিলেন জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের খতিব হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দীন আল কাদেরী। দ্বিতীয় জামাত পড়ান সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ আহমদুল হক আল কাদেরী।

প্রথম জামাতের পর খুতবায় হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দীন আল কাদেরী দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দুহাত তুলে মোনাজাত করেন। তাঁর কণ্ঠে অনুরণিত হয় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান, যা উপস্থিত হাজারো মুসল্লির হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার প্রেরণা জোগায়।

জমিয়তুল ফালাহ ময়দানের এই প্রধান জামাত কেবল ধর্মীয় জমায়েত ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সব ভেদাভেদ ভুলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান তূর্য, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির নেতা মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, নগর বিএনপি নেতা আবুল হাশেম বক্কর, জাতীয় পার্টির নেতা সোলায়মান আলম শেঠ এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা শামসুজ্জামান হেলালী। নামাজ শেষে এই নেতাদের হাসিমুখে কুশল বিনিময় ও একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করার দৃশ্য সাধারণ মানুষের মনে এক দারুণ স্বস্তি এনে দেয়।

ঈদের এই আনন্দঘন মুহূর্তে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করেছেন নেতারা। সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, সমাজে বিদ্যমান এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ আমাদের ধরে রাখতে হবে। তিনি সবার মনের দুঃখ, দারিদ্র্য ও বৈষম্য ঐক্যবদ্ধভাবে দূর করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ঈদের দিনে তাঁদের প্রত্যাশা হলো আগামী দিনে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে যেন আর কেউ ছিনিমিনি না খেলে। তিনি একটি সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

পাশাপাশি, সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান তূর্য কিছুটা আবেগঘন কণ্ঠে জানান, জনপ্রতিনিধির ঈদ হলো আনন্দ বণ্টনের দায়িত্বের ঈদ। সবার দিন আজ হয়তো একইভাবে কাটছে না, তবে আগামী ঈদ যেন সবার ঘরে সমান আনন্দ নিয়ে আসে, সেই শপথ নেওয়ার কথাই জোর দিয়ে বলেন তিনি।

জমিয়তুল ফালাহ ছাড়াও নগরের অন্যান্য স্থানেও ছিল ঈদের বিপুল আয়োজন। কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির উদ্যোগে এম এ আজিজ স্টেডিয়াম জিমনেসিয়াম মাঠ প্রাঙ্গণে সকাল সাড়ে আটটায় বিশাল ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইমামতি করেন বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল হযরত মাওলানা অধ্যক্ষ ড. সাইয়েদ মুহাম্মদ আবু নোমান। ঈদ জামাত কমিটির উদ্যোগে নগরের মোট নব্বইটি স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে লালদীঘি শাহী জামে মসজিদ, হযরত শেখ ফরিদ (র.) চশমা ঈদগাহ মসজিদ, সুগন্ধা আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, চকবাজার সিটি করপোরেশন জামে মসজিদ, জহুর হকার্স মার্কেট জামে মসজিদ, দক্ষিণ খুলশী (ভিআইপি) আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, আরেফীন নগর কেন্দ্রীয় কবরস্থান জামে মসজিদ, সাগরিকা গরুর বাজার জামে মসজিদ এবং জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়াম সংলগ্ন মা আয়েশা সিদ্দিকী চসিক জামে মসজিদেও উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদের জামাত আদায় করেন মুসল্লিরা।

এত বড় এক কর্মযজ্ঞ ও উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ এলাকাসহ নগরজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশেষ টহল জোরদার করার কারণে মানুষ নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারছে। দিনশেষে এই কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ আর সম্প্রীতির বার্তা চট্টগ্রামের মানুষের মনে গেঁথে থাকবে আরও একটি বছর।