
আমার শিশুকালে ঈদের দিনটি কেমন ছিল? বাংলাদেশের পল্লীগ্রামে জন্ম নেওয়া, খোলা মাঠে-ঘাটে বেড়ে ওঠা সময়ে বছরের দু’টো ঈদের দিনের কথা বলতে গেলে স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে তখনকার গ্রামীণ জীবনাচারের নানাবিধ চিত্র। আজও দিব্যি চোখে দেখি, রমজানের ঈদের দিন বা ঈদুল ফিতরের দিনটা খুব বেশি জমজমাট বা আনন্দ-মধুর না হলেও কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহার দিনটার কোনো তুলনা ছিল না। ঈদুল ফিতরের দিন সবচেয়ে খুশির বিষয় ছিল রোজা শেষ হয়ে গেছে। ভোর রাতের সাহরি খেতে হবে না। মায়ের কাছে বায়না ধরতে হবে না। বড়দের মতো খাওয়ার জন্য আগেভাগে গিয়ে বসে থাকতে হবে না। রোজা রাখার বয়স না হলেও রোজার আনন্দ ছিল অপরিমেয়।
সেকালে আরও একটা অনির্বচনীয় আনন্দের ঘটনা ছিল প্রতি রাতের তারাবির নামাজ আদায়। বাবার ভয়ে আমাদের সকল চাচাই নামাজে অংশ নিতেন। নামাজ শেষে আমরা ছোটরাও জোরে আওয়াজ তুলে দরুদ শরিফ পড়ায় গলা মিলাতাম। তবে দুঃখের কথা ছিল স্কুলের ছুটি শেষ হওয়া। দু-এক দিনের মধ্যেই স্কুল খুলে যাবে। প্রতিদিন অন্তত ২/৩ কিলোমিটার দূরের রাস্তা পায়ে হেঁটে স্কুলে পৌঁছাতে হবে।
ঈদের দিন আমার বাবাকে দেখতাম খুব সকালে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। এরপরই বাড়ির সবাইকে ডাকাডাকি করতেন। তাড়াতাড়ি জেগে ওঠো, গোসল করতে যাও, ঈদের মাঠে আগে যেতে হবে। ঈদের মাঠে সবার আগে গেলে অধিকতর সওয়াব পাওয়া যায়। সেদিন বাড়ির লোকজন কেউ কেউ পুকুরে স্নান করতেন আবার কেউ টিউবওয়েলে করে নিতেন। কিন্তু মা, চাচি, মহিলারা কুয়া থেকে পানি তুলে স্নান সেরে নিতেন। তাঁরা মূলত বাড়ির পেছনের দিকের অন্দরে বিচরণ করতেন। বাবা-চাচারা আমাদের বাড়িতে থাকা গরু-বাছুরদেরও গোসলে নেওয়ার জন্য কাজের লোকদের তাগাদা দিতেন। ঈদের দিন মানুষের মতো গরু-ছাগলেরও গোসল করানো ছিল বাধ্যতামূলক। মনে হতো তাদের জন্যও সে দিনটা ছিল একটা বিশেষ দিন।
আমরা নতুন জামাকাপড় পরে বাবা-চাচাদের পেছনে হাসিমুখে হেঁটে হেঁটে স্থানীয় হাজিবাড়ির পুকুরপাড় মাঠে ঈদের নামাজে যেতাম। আমার বাবাকে সবসময় প্রথম সারিতে ইমামের সোজা পেছনে দাঁড়াতে দেখেছি। কারণ তিনি প্রায় সকলের আগে মাঠে হাজির হয়ে যেতেন। ঈদের নামাজ শুরু হওয়ার আগে স্থানীয় বিশিষ্ট ও শিক্ষিত মানুষের মধ্যে দু-চারজন ইমামের কাছ থেকে মাইক নিয়ে কথা বলতেন। তাঁরা এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন নিয়ে কয়েক মিনিটের বক্তব্য রাখতেন। তখন মাঠের কাতারবন্দি মুসল্লিগণ অতি গুরুত্বের সঙ্গে শুনতেন। বড়রা নামাজ পড়তেন আর ছোট্ট শিশুরা ভিড় করত পুকুরের পশ্চিমপাড়ে শিশুদের খেলার সরঞ্জাম ও খাবারের জিনিস নিয়ে ছোট ছোট দোকানের পসরাতে। সেদিন সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট ছিল হরেক রকম মার্বেল কেনা এবং গ্রামের মেঠো পথে পথে মার্বেল খেলা। খাওয়া-নাওয়া ভুলে মার্বেল খেলায় মেতে উঠতাম।
তবে বাবা এবং মুরুব্বিদের দেখলে খেলা বন্ধ করে লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করতাম। শিশুদের খাবারের মধ্যে রঙিন হাওয়াই মিষ্টি, লাঠি লজেন্স, চটা বিস্কুট, মুড়ির তৈরি নাড়ু আর গলায় কাঠের বাক্স ঝুলিয়ে বিক্রি করা বাঁশের কাঠিবাঁধা লাল ও সবুজ আইসক্রিম।
এতকাল পেছনে ফেলে এসে এখনো মনে পড়ে, ঈদের মাঠ থেকে ফিরে প্রথমেই বাড়ির মুরুব্বিজন দাদি, মা, চাচিকে ঘরে ঘরে গিয়ে কদমবুসি করা হতো। তাঁরা মাথায় হাত রেখে দোয়া করতেন। প্রয়াত দাদা ও পূর্বপুরুষের কবরস্থানের কাছে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে প্রার্থনা করা। বাবা বলতেন, ঈদের দিন কবরবাসীরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করেন, তাঁদেরকে কেউ স্মরণ করে কি না।
তবে ঈদুল আজহার আনন্দ ছিল বহুমাত্রিক এবং অতুলনীয়। কুরবানির জন্য প্রস্তুত গরু, ছাগলের সংখ্যা গোনা হতো। কার বাড়িতে কয়টা গরু, কারটা কত বড়, কত দাম এগুলো নিয়ে শিশুদের মধ্যে বাগযুদ্ধ হতো। আমরা শিশুরা গ্রামের পাড়ায় মহল্লায় ঘুরে কুরবানির গরু, ষাঁড়, ছাগল ইত্যাদির জবাইকালে আল্লাহু আকবর চিৎকার শুনতাম। মনে পড়ে, গরুর মাংস পাড়ার মধ্যবর্তী কোনো বাড়িতে জমা করা হতো। সেখান থেকে গরিব এবং কুরবানি দিতে অক্ষমদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো।
সেদিনও বিকেলে মার্বেল খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা, ফুটবল, ভলিবল খেলা হতো। পাড়া-মহল্লার এর বাড়ি ওর বাড়িতে যাওয়া-আসা হতো। সামাজিকতা আর সুসম্পর্কের দৃশ্য চোখে পড়ত। সেদিন আরও একটা বিষয় নজরে আসত গরুর চামড়া কেনাবেচায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে প্রতিবেশী নিকটজনরা এগুলো ক্রয় করতেন এবং সন্ধ্যায় স্থানীয় বাজারে নিয়ে অন্য বড় ক্রেতার কাছে বিক্রি করে সামান্য লাভবান হতো।
আমাদের সময়ে গ্রামে আরও একটা অসাধারণ বিষয় ছিল। যা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। আজকাল এর প্রচলন উঠেই যাচ্ছে বলা চলে। একক নামে বা ভাগাভাগি করে কুরবানি দেওয়া, চাচা, চাচাতো ভাই, ভাইপো, প্রতিবেশী মিলে ছয়-সাত নামেও কুরবানি হতো। মাংস কাটা শেষ হলে অপরাহ্নে মাংসের একাধিক পোঁটলা বানিয়ে নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। আমরা বাইসাইকেলে বা ট্রেনে করে গিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে তা পৌঁছে দিতাম। বিশেষ করে বিবাহিত কন্যার শ্বশুরালয়ে মাংস পৌঁছাতেই হতো। এটা করতে হতো কন্যার সম্মানে। আবার তাদের বাড়ি থেকেও কয়েক টুকরো মাংস দিয়ে দেওয়া হতো।
এখন ভাবি, এটা ছিল সমাজজীবনের এক অকৃত্রিম তথা অভাবনীয় আত্মিক বন্ধনের বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে চাপা পড়ে এগুলো ধীরে ধীরে উঠে যাওয়ার ফলেই হয়তো আজকের সামাজিক অন্যায়, অনাচার, অনিষ্টকারিতা আর অসংবেদনশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনে শান্তিশৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে এমন সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে হয়।
যদিও আমাদের গেছে যে দিন তা একেবারেই গেছে। সময় ও স্রোত পেছনে তাকাতে জানে না।
ঈদ মোবারক।
লেখক: সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার।