
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের মর্মান্তিক সংঘর্ষের ঘটনায় হেলাল উদ্দিন ও মেহেদী হাসান নামের দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার সময় তাঁদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আজ রোববার সকাল ৯টার দিকে এই দুজনকে বরখাস্ত করা হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া জানান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় দায়িত্বরত গেটম্যান হেলাল উদ্দিন ও মেহেদী হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে পালাক্রমে দুজন গেটম্যান সিগন্যালের কাজে নিয়োজিত থাকেন।
মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া আরও জানান, ঢাকা মেইল ট্রেনটি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ের গেটম্যানের সিগন্যাল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন গেটম্যানকে না পাওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের গ্যাপ হয়ে যায়। যখন গেটম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে, ততক্ষণে বাসটি ক্রসিংয়ে উঠে গিয়ে ট্রেনটির মুখে পড়ে। এই ঘটনার সঠিক কারণ খুঁজতে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া উল্লেখ করেন।
এ ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিটির সদস্যদের দুর্ঘটনার কারণ জানাতে বলা হয়েছে। আজ সকালে মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া কুমিল্লার জেলা প্রশাসন এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান জানান, জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরীকে। তদন্ত কমিটির অন্য চার সদস্য হলেন কুমিল্লা বিআরটিএ-এর সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আলম, ময়নামতি হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল মমিন, কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. সাহাব উদ্দিন এবং কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অতিরিক্ত পরিচালক ইকবাল হোসন।
জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান আরও জানান, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন চিকিৎসাধীন আছেন। এ ছাড়া আহত ১৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে বলে মু. রেজা হাসান নিশ্চিত করেছেন।
দুর্ঘটনার পর প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া জানান, উদ্ধারকাজ শেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রেল যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়। এর আগে সকাল সোয়া আটটায় আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। উদ্ধারকাজ শেষে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, গতকাল রাত ২টা ৫৫ মিনিটে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। তবে আজ সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে কুমিল্লা রেলস্টেশন থেকে টু ডাউন (চট্টগ্রাম মেইল) চট্টগ্রাম অভিমুখে ছেড়ে যায় এবং সাড়ে ১০টার দিকে উদ্ধারকাজ শেষে দুই দিকের ট্রেন চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয় বলে মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া নিশ্চিত করেন।
আজ বেলা ১১টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, সম্ভবত গেটটা খোলা ছিল, যার কারণে ওই বাসের চালক রেললাইনে উঠে যান এবং পরে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ এই দুর্ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যাতে পরিবারের সদস্যরা অন্তত লাশটা নিয়ে যেতে পারেন। দুর্ঘটনার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে উল্লেখ করে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ আরও বলেন, যেহেতু এটি হাইওয়ের ওপরে অবস্থিত একটি ক্রসিং, তাই এটিকে নিয়ে একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে।