
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে একটি বন্যহাতিকে হত্যার পর গোপনে মাটিচাপা দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি আড়াল করতে মাটিচাপা দেওয়া স্থানে একটি ঝুপড়ি ঘরও নির্মাণ করে জড়িত চক্র। তবে দীর্ঘ এক মাস পর মাটিচাপা দেওয়া স্থান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে বৃহস্পতিবার হাতির গলিত মরদেহ উদ্ধার করে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় লোকজন ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাকারা বনবিটের মুসলিমনগর এলাকার করিম্মাকাটা ঘোনা বনাঞ্চলের গভীরে প্রায় ১০ বছর বয়সী এই বন্যহাতিটিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এরপর অত্যন্ত কৌশলে হাতির মরদেহ মাটির গভীরে পুঁতে ফেলে সন্দেহ এড়াতে ওই স্থানের ওপর একটি ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়। ঘটনার প্রায় এক মাস পর ওই স্থান থেকে পচা দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয় এবং তাঁরা বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর নলবিলা বনবিটের টহলরত কর্মীরা তদন্ত শুরু করলে পুরো ঘটনাটি সামনে আসে।
খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাস্থলে যান চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান, চকরিয়া থানা পুলিশ, ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা। সবার উপস্থিতিতে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান মাটিচাপা দেওয়া হাতির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেন।
ময়নাতদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হাতিটিকে গুলি করে অথবা জেনারেটরের মাধ্যমে ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে হাতির মাংস পচে যাওয়ার কারণে মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ জানতে ল্যাব টেস্টের সহায়তা নেওয়া হবে বলে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান জানান, ময়নাতদন্তের পর হাতির গলিত মরদেহ পুনরায় মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী মামলা রুজুসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে বলে মো. সাদেকুর রহমান নিশ্চিত করেন।
এদিকে দীর্ঘ এক মাস ধরে বিশাল একটি প্রাণীর মরদেহ মাটিচাপা অবস্থায় থাকা এবং তার ওপর ঘর নির্মাণের বিষয়টি বনকর্মীদের নজরে না আসায় চরম দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। তাঁরা এই ঘটনায় দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি বনাঞ্চলে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, কক্সবাজার অঞ্চলের বনাঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বন উজাড়, অবৈধ দখল এবং বসতি সম্প্রসারণের কারণে বন্যহাতির আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে হাতির পাল লোকালয়ে চলে আসায় মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে মাহমুদুর রহমান মাহমুদ সতর্ক করেন।
প্রসঙ্গগত, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যহাতি হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে বন্যপ্রাণী রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।