
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে ৫৬ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ও গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী। তাঁর এই ভোটপ্রাপ্তি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেয়াকত আলীর প্রাপ্ত ভোটের একটি অংশ সাধারণ ভোটারদের সমর্থন এবং অপর অংশটি বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ভোট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, লেয়াকত আলী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতে পারতেন। তবে লেয়াকত আলী ও মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার মধ্যকার ভোট বিভাজনের সুযোগে জয়লাভ করেন জামায়াত তথা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা জহিরুল ইসলাম।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লেয়াকত আলীকে রাষ্ট্রদ্রোহসহ তিন ডজনেরও বেশি মামলার মুখোমুখি হতে হয়। কয়েকটি মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান। পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তা না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে থাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাঁকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করে।
এবার স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাঁশখালীর রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছে। লেয়াকত আলীর নেতৃত্বে গঠিত ‘বাঁশখালী মজলুম ঐক্য পরিষদ’ আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদেও প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দল থেকে বহিষ্কারের পর এটি লেয়াকত আলীর রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। একইসঙ্গে ‘মজলুম ঐক্য পরিষদ’কে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের প্রার্থীরা স্থানীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং এতে মাওলানা জহিরুল ইসলামের দলের প্রার্থীরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গগত, ২০১৬ সালে বাঁশখালীর গণ্ডামারায় নির্মিত এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট বিরোধী বিক্ষোভ করে আলোচনায় আসেন লেয়াকত আলী। তৎকালীন সময়ে তিনি এস আলম গ্রুপ ও চীনের একটি কোম্পানির মালিকানাধীন কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘বসতভিটা গোরস্থান রক্ষা কমিটি’ নামক সংগঠনের ব্যানারে সমন্বয়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন।
এ ব্যাপারে জানার জন্য গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলীকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আলী নবী মেম্বার জানান, লেয়াকত আলী বর্তমানে অসুস্থ থাকায় বিশ্রামে আছেন।
মজুলম ঐক্য পরিষদ থেকে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আলী নবী মেম্বার জানান, বিএনপি যদি তাঁদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে প্রার্থী দিতে চায়, তাহলে তাঁরা যৌথভাবে প্রার্থী দেবেন। আর আলোচনা না করলে তাঁরাও নিজস্ব প্রার্থী দেবেন। আলী নবী মেম্বার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি নেতারা চাননি মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বা লেয়াকত আলী সংসদ সদস্য হোন। বিএনপি নেতারা চাইলে অন্তত একবার লেয়াকত আলীর ঘরে যেতেন। সালাহউদ্দিন কিংবা খসরু অথবা প্রয়াত জাফর সাহেবের স্ত্রী বললেও লেয়াকত আলী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতেন বলে আলী নবী মেম্বার উল্লেখ করেন।
আলী নবী মেম্বার আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি নেতারা উল্টো ভয় দেখিয়েছিলেন যে লেয়াকত আলীর মামলাগুলোতে সাজা করানো হবে এবং তিনি গণ্ডামারায় ৫-৬ হাজার ও পুরো বাঁশখালীতে মাত্র ৪ হাজার ভোট পাবেন। আলী নবী মেম্বার দাবি করেন, টাকার অভাবে ৪০টি কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে না পারায় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং করে লেয়াকত আলীকে হারানো হয়েছে, যদিও তাঁদের হিসাবে লেয়াকত আলী ৮০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে দল মূল্যায়ন করলে তাঁরা আলোচনায় বসতে রাজি, অন্যথায় নিজেদের রাজনীতি চালিয়ে যাবেন বলে আলী নবী মেম্বার সাফ জানিয়ে দেন।