সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

গ্যাস উৎপাদনে ধস: আমদানিনির্ভরতায় চরম ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১১:৩২ পূর্বাহ্ন


স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। একসময়ের নির্ভরযোগ্য এই জ্বালানি খাতের উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১৭০ কোটি ঘনফুটে। পরিসংখ্যান বলছে, গত আট বছরের ব্যবধানে দেশে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলনে এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে পেট্রোবাংলাকে এখন নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর। কিন্তু এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বিদ্যমান এই জাতীয় সংকট মোকাবেলায় এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার ৩০ মার্চের গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ ২৫২ কোটি ৯৮ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি ৮২ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট এবং স্থানীয় উত্তোলন মাত্র ১৭১ কোটি ঘনফুট। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্থানীয় উত্তোলনের সিংহভাগই আসছে বিদেশি দুই কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর (৯৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট) মাধ্যমে, যেখানে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সরবরাহ করছে মাত্র ৭৫ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।

দেশে বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে, যার মধ্যে ২০টি থেকে নিয়মিত গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। অথচ আট বছর আগে ২০১৮ সালেও রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিদেশি কোম্পানি মিলে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করত, যা দিয়ে শিল্প ও আবাসিকসহ সব খাতের চাহিদা মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় স্থানীয় উৎপাদনে জোর না দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতাচ্যুত এই সরকারের আমলে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ঠিক রাখার এক আত্মঘাতী নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। সরবরাহ বাড়াতে সে সময় ৫০টি গ্যাস কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে ৩০টির বেশি কূপ খনন করা সম্ভব হয়নি। যেসব কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া গেছে, পাইপলাইনের অভাবে বিশেষ করে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না। সরকার এখন ভোলার গ্যাস এলএনজিতে রূপান্তর করে মূল ভূখণ্ডে আনার বিকল্প পরিকল্পনা করছে।

আমদানিনির্ভর এই নীতির কারণে জ্বালানি খাতে বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এলএনজি কিনতেই দেশের ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট মার্কেট থেকে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, যা অর্থনীতির ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। পতিত সরকারের আমলে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো বিদেশি কোম্পানি তাতে সাড়া দেয়নি এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যে তারা স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে শ্রীকাইল ও বিয়ানীবাজার থেকে কিছুটা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। কূপ খনন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে নতুন দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

অন্যদিকে, এই আমদানিনির্ভর নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, গত দুই দশক ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে। গ্রিডে যে পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ফুরিয়ে যাচ্ছে। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও বিগত সরকার গ্যাস অনুসন্ধানকে নিষ্ক্রিয় রেখে আমদানিতেই বেশি জোর দিয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, যা রাষ্ট্রের একটি বড় ব্যর্থতা।

তবে সংকট উত্তরণে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে ৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে ১১৭টি কূপ খননের মাধ্যমে ১৫৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।